শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন
কবিতা জীবনের মন্ত্র। কবিতা মানুষকে শক্তি দেয়, নতুন করে জেগে উঠবার প্রেরণা যোগায়। মানুষের মুক্তিতেই কবিতার জয়যাত্রা। স্বাধীনতা যেমন মানুষের বিজয়, সেটা একই ভাবে কবিতারও বিজয়। কবিতায় বড় ভূমিকা পালন করে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, সম্পর্কের টানা-পোড়েন, সম্পর্কের ব্যর্থতা, এবং সংগ্রাম। প্রকৃতি ঐ মানুষের হাত ধরেই আসে। মানুষের কাদা-জল, মানুষের মাটি- প্রকৃতি কবিতার মূল ভিত্তি।
পৃথিবীর ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। অনেক নতুন টানা-পোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। সব ভাষার কবিতারই নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলা কবিতা নিজেকে পৃথিবীর স্রোতে আবিষ্কার করেছে। আমরা এখন বিশ্বের মুখোমুখি হয়েছি। এই উদ্দীপনা অনেক গভীর থেকে এসেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে, সংসারের টানাপোড়েনে মানুষ নিয়ত সংগ্রামে রত। মানুষের বেঁচে থাকার মধ্যেই কবিতাকে তার জায়গা খুঁজে নিতে হয়। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়াসটা কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে।
বর্তমানের নিষ্ঠুর-স্বৈরাচার সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে গেলে কবিতার একটা নতুন কাঠামো, একটা নতুন নন্দনতত্ত্ব দরকার, নতুন নির্মাণ দরকার। আর সেটা শুধু কবির কণ্ঠস্বর নয়, বিশ্বের সকল সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে। কবিদের ভিতরে নতুন করে লিখবার অনুপ্রেরণা যে চেতনার সৃষ্টি করেছে তা এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রয়োজন রয়েছে। এই কাব্য চেতনা যদি জাগিয়ে তোলা যায় যে আমাদের এখন নতুন ধারার নির্মাণ প্রয়োজন, যে নির্মাণ মানুষের বেঁচে থাকার এবং মুক্তির স্বপক্ষে। সেই নির্মাণকে সত্য করতে গেলে আমাদের সম্পূর্ণ নতুন কবিতার কথা চিন্তা করতে হবে।
সৃজনশীলতার আভা যাতে বারবার কবিকে ছুঁয়ে যেতে পারে সেজন্যে সাধনার প্রয়োজন। সৃজনশীলতা যত উন্মুখ হবে, সাধনাও তত বেড়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ার প্রধান বাধা হচ্ছে কবির আর্থিক অসচ্ছলতা। বাংলাদেশের একজন মহৎ কবিরও শুধু কবিতা লিখে জীবন ধারন করা সম্ভব নয়। আমাদের কবিদের কবিতা লেখা ছাড়াও আরও অনেক কাজ করতে হয় জীবন ধারনের জন্য। এক অভাবনীয় অবস্থার মধ্যে থেকেও তাঁরা কবিতা চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইউরোপ এবং আমেরিকার একজন কবি কবিতা লিখে যে আয় করেন, তাতে তাঁর জীবনযাপন চলে যায়; যেটা আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ কবির বেলায়ও কল্পনার অধিক জিনিস। তবু আমাদের দেশে কবিতা চর্চা সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে।
কবিতায় ছন্দের বিষয়টা খুব গভীর। ছন্দ কোন আরোপিত ব্যাপার নয়, যেমন ধ্রুপদী সঙ্গীতের যে তাল লয় সেটা মানুষের জীবন ধারার উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। একই ভাবে আসে ছন্দও। কবিতার যে গতি ও লয় তা মানুষের জীবনধারা, তার সংগ্রাম, তার প্রেম, বিজয়- ইত্যাদির ভেতর থেকে গড়ে ওঠে। কবিতার ভাষা এবং লয়ের নির্মাণ যদি মানুষের সংগ্রাম, তার আকাংখার ভেতর থেকে উঠে আসে, তবেই হবে প্রানের ছন্দ।
কোন দেশের কবিতা চর্চা, কবিতার বিষয় সেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। পশিম বাংলার লেখা আর বাংলাদেশের লেখা মিলিয়েইতো বাংলা সাহিত্য। একই ভাষার রচনার উপর দেশ ভিত্তিক তুলনা সাহিত্য বোধের উপযোগী নয়। বরং অন্য ভাষার সাহিত্যের সাথে তুলনাটা আসতে পারে যে সেই সাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যের অবস্থানটা কেমন। পশ্চিমবাংলার লেখার সাথে বাংলাদেশের লেখার কিছুটা পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। এই পার্থক্যটা এমন যে যুক্তরাষ্ট্রের লেখার সাথে যুক্তরাজ্যের লেখার ভিতরে যে পার্থক্য সেরকম। আমাদের দেশের প্রকৃতি এবং মানুষের বেঁচে থাকার যে সংগ্রাম- এ ধরনের চরিত্রগত পার্থক্যতো রয়েছেই, সেটা লেখায় ধরা পড়বে। একজন লেখকের সামগ্রিক অবস্থানটা তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। তাই চর্চার ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের কবিরা যে নতুন ভাবে চিন্তা করছেন, লেখায় নতুনতর মাত্রা যোগ করে চলেছেন, এটাই উন্নত সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষণ। এগুলোর পরিণতি বুঝতে হয়তো বহু বছর লেগে যাবে।
প্রবাসে থেকেও উন্নত মানের সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব। ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিশ কবিরা যখন মাদ্রিদে থাকতেন তাঁরা স্প্যানিশ কবিতার নবজন্ম ঘটিয়েছিলেন। যারা প্রবাসে বাংলা কবিতা চর্চা করছেন তাঁরা জগৎটাকে অন্যভাবে দেখছেন। তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থে একনিষ্ঠ ভাবে চর্চা করে যান তাহলে কবিতা একটা নতুন মাত্রা পেতে পারে। বাংলা সাহিত্যের প্রবাসী কবি অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসুও কিছুদিন প্রবাসে থেকেছেন, তবে তাঁরা প্রবাসে জীবন যাপন করেননি। এখন অনেক কবি প্রবাসে জীবন যাপন করছেন, সেখানকার সুখদুঃখ ও দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে আছেন। তবে জরুরী বিষয় হচ্ছে, স্বদেশে লেখকের শিকড় গভীরে প্রোথিত থাকতে হবে, তাহলে প্রবাসের ভিন্ন আবহাওয়ায়ও তা ডালপালা বিস্তার করতে পারবে।
একজন পাঠক যখন একটা কবিতা পড়ে তখনকার বাস্তবতা এমন যে সেখানে রয়েছে একটা কবিতা এবং একটা বড় সত্য হচ্ছে যিনি সেটা পড়ছেন। পাঠকের পড়াটাই ঐ সময় কবিতাটাকে নির্মাণ করছে। কবি যে অর্থে লিখেছেন, পাঠক হয়তো অন্য অর্থে সেটি নির্মাণ করছেন। সুতরাং, কবি, কবিতা এবং পাঠক; এই তিনজনকে মিলিয়ে একটি জগত তৈরি হয় এবং সেই জগতটা যখন আলোকিত হয়ে ওঠে একটা কবিতার মাধ্যমে- তখন ঐটিকে বলা যায় উত্তম রচনা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...