শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৩ পূর্বাহ্ন

পুতুল পুতুল মূর্ছনা : রাশেদ রউফ

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ১২৩ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ন

মারুফুল ইসলাম (১৯৬৩-) এক বহুমাত্রিক লেখক। তিনি একাধারে কবি, ছড়াসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, কথাসাহিত্যিক ও গীতিকার। অনেক আগেই তিনি অর্জন করেছিলেন সাহিত্যবোধ ও শিল্প চেতনা। বড়দের সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর যেমন অবাধ বিচরণ, তেমনি ছোটদের মনোজগতও তাঁর করায়ত্ত। ছোটদের কল্পনাপ্রবণ মনকে প্রসারিত করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করি তাঁর রচনায়। শিশু এবং কিশোরের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে এবং রুচিশীল মন ও মনন গঠনেও তিনি সবসময় সজাগ ও সচেতন। শুধু শিশুকিশোরদের মানসিক ক্ষুধার নিবৃত্তি নয়, তাদের মানসিক পুষ্টির দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে তাঁর।

কাব্য-স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল ও অনন্যসাধারণ তিনি। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় ‘বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য চিন্তাভাবনা, বোধ অনুভূতি, প্রেম-বিরহ, প্রতিদিনের ছবি, মানুষে মানুষে সম্পর্ক।’ মারুফুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের প্রশংসা করেছেন আমাদের দেশের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকরা। তাঁদের চমৎকার মূল্যায়নে পাঠকরা অভিভূত না হয়ে পারেন না। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কবিতার মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, ‘মারুফুল ইসলামের কবিতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য, বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কবিতায় শিল্প-সৌন্দর্য গড়ার আগ্রহ তার কবিতায় নেই। আবার শিল্প-সৌন্দর্যকে বাতিল করে ইশতেহার জাতীয় কবিতা রচনার প্রবণতাও তার মধ্যে নেই। তিনি এক্ষেত্রে বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দিয়েছেন। লিখছেন আত্মজৈবনিক কবিতা; কিন্তু তার প্রতীক ও ব্যঞ্জনাগুলো আটপৌরে নয়। বহু নতুন শব্দ ও প্রতীক তিনি আবিষ্কার করেছেন; যা তার নিজস্ব এবং যা তাকে কবি হিসেবে, স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশের রাজনীতির প্রগতিশীল ধারার প্রতিও তার কবিতার আনুগত্য লক্ষ করার মতো।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘পাঠক মারুফুল ইসলামের কবিতা পড়বে সমৃদ্ধ হতে, কবিতার স্বাদ পেতে। আনন্দ পেতে, চিন্তার খোরাক পেতে।’ অন্যদিকে আহমদ রফিক মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: ‘মারুফুল ইসলাম আধুনিক সমাজ সচেতনতার কবি, জীবনের অলিগলিতে পথ চলার এক নাগরিক কবি। তার পর্যবেক্ষণে কবির আত্ম-অন্বেষা, জীবন অন্বেষার পাশাপাশি সমাজ অন্বেষাও লক্ষণীয়।’ এছাড়া প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ অনেকেই মারুফুল ইসলামের কবিতার প্রশংসা করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। কবিতায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭।

 

দুই

শিশুসাহিত্যেও মারুফুল ইসলাম অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। একজন সক্রিয় শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তিনি প্রকাশ করে চলেছেন একটার পর একটা বই। তাঁর ‘পুতুল পুতুল মূর্ছনা’ (২০১৬), ‘কমলাফুলির টিয়ে’ (২০১৭), ‘মুঠোর ভেতর রোদ’ (২০১৮), ‘পুতুলের নাম টিয়ানা’ (২০১৮), ‘শুকনো পাতার নূপুর’ (২০১৯) ইত্যাদি অসাধারণ শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ। তিনি বুকের ভেতর পোষণ করেন একটি নির্মল শিশুমন।

‘পুতুল পুতুল মূর্ছনা’ মারুফুল ইসলামের নিখাদ গ্রন্থ, যেটি শিশুরঞ্জনী ছড়ার বই হিসেবে অনবদ্য। বলে রাখা দরকার যে, মারুফুল ইসলাম যখন ছোটদের জন্য লেখেন, তখন শুধু তাদের কথা ভেবেই লেখেন। তাদের মনোরঞ্জন ও মনের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য উদ্যোগী হয়ে লেখেন। তিনি নিবেদিত থাকার চেষ্টা করেন তাদের জন্য সাহিত্য সৃষ্টির নতুন প্রেরণায়।

তাই মারুফুল ইসলামের রচনায় অভিনব প্রয়াস লক্ষ করা যায়; তা কখনও বিষয় বৈচিত্র্যে, কখনও উপস্থাপন-রীতিতে। আমরা তাঁর রচনা পাঠে যখন মনোযোগী হই, তখন দেখি-তিনি কখনও গল্প কথার নতুন আবেশ ছড়িয়ে, কখনওবা শব্দের রহস্যময় রোমাঞ্চময় পটভূমির মাধ্যমে শিশুকিশোরদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। মোট কথা, তাঁর রচনা শিশুকিশোরদের মন ও মানস গঠনে সহায়ক হয়ে উঠেছে।

২০১৬ সালে চন্দ্রাবতী একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘পুতুল পুতুল মূর্ছনা’ গ্রন্থে মোট ৩৫টি ছড়া অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বইয়ের প্রতিটি লেখার মধ্যেই ফুটে উঠেছে শিশুর প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দরদ। তাঁর ছড়ায় আছে ছোটদের মন ভোলানো রূপকথার কাহিনি, আছে স্বপ্নরাজ্যের হাতছানি। এই গ্রন্থের উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

মূর্ছনা,

তোর গালে আমার নাক ডুবিয়ে রাখি

তোর চোখের ভেতর থই হারিয়ে থাকি

তোর কাঁচা কাঁচা আদর গায়ে মাখি

তোর হাজার নামে সহস্রবার ডাকি

তবু মন ভরে না

মন ভরে না

অসাধারণ। মূর্ছনার মাধ্যমে আসলে তিনি শিশুদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার কথাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি শিশুদের গড়ে তুলতে চান আদরে-ভালোবাসায়। পৃথিবীর সকল ঘাত-প্রতিঘাত, দুঃখ-কষ্ট যেন শিশুর শরীর স্পর্শ করতে না পারে, তা-ই তিনি চান। ছোটদের স্বপ্ন দেখাতে গিয়েই তিনি ছড়ায় ঘুরে ফিরে এনেছেন শিশুরঞ্জনী ছবি। আদি ছড়ার অকৃত্রিম রসকে সম্বল করে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন তাঁর লেখাগুলোকে। বলেছেন:

সাত আকাশের আলো

কী করে চমকালো

হঠাৎ আমার হাতে

দেখি দুচোখ খুলে

ফেরেশতা তুলতুলে

বুকের বিছানাতে।

[সাত আকাশের আলো]

কিংবা,

চাঁদের মুখে চাঁদের হাসি

আকাশপাতাল ভাবনারাশি

খেয়ালখুশির আনাগোনা

আকাশকুসুম স্বপ্নবোনা

[আকাশকুসুম]

মারুফুল ইসলাম ছোটদেরও প্রিয় লেখক। সহৃদয় স্নেহ আদর আর ভালোবাসায় তৈরি করেছেন ছোটদের নিজস্ব জগৎ, গড়ে তুলেছেন তাদের বিশ্বস্ত ঠিকানা। বলতে পারি, শিশুকিশোর মনস্তত্ত্ব তাঁর দখলে। তাঁর রচনার ভুবন যেমন চিত্তহারী, আকর্ষণীয়; তেমনি মজাদার। তাঁর রচিত শিশুকিশোর উপযোগী গ্রন্থগুলো শিশুকিশোর মনকে রঙিন, বর্ণিল ও উজ্জ্বলতর করতে সক্ষম। ছোটদের জন্য রচিত এই বইগুলোতে যেমন রয়েছে নির্মল আনন্দের উপাদান, তেমনি রয়েছে ছোটদের সরল কোমল সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকাশের যাবতীয় অনুষঙ্গ। তিনি তাঁর ছড়ার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকিশোরদেরও এগিয়ে নেন সামনের দিকে। ছড়াগুলো যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি চিত্তাকর্ষক।

‘খুকুর স্বপ্ন’ শীর্ষক ছড়ায় আমরা পাই নতুন ব্যঞ্জনা। ছড়াটি এরকম:

 

আকাশ থেকে বৃষ্টিধারা

ঝরে অবিরল

পুকুর হয়ে উঠল খুকুর

যুগল করতল

 

পুকুরটা যে বেড়ে বেড়ে

হলো সরোবর

এখন একটা নৌকা যে চাই

কোথায় কারিগর

ও কারিগর শুনতে কি পাও

কোনো সাড়া নেই

স্বপ্ন দিয়ে নৌকো সাজাই

খুকুর চোখেতেই

 

খুকুর চোখে স্বপ্নরঙিন

আলো দেখেছি

আলোয় রাঙা বাংলাদেশের

ছবি এঁকেছি

মারুফুল ইসলাম এমন এক লেখক, যার ভিতরে সৃষ্টির ব্যাকুলতা আছে, আছে অন্তর্গত তাগিদ। তিনি ছড়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দেশ-জাতির কথা তুলে ধরেন, তুলে ধরেন নিজের স্বপ্নের কথা। নানা ধরনের ছড়া লিখতে তিনি সিদ্ধহস্ত হলেও শিশুরঞ্জনী ছড়ায় বেশ প্রাণবন্ত। শিশুতোষ ছড়া নির্মাণে তাঁর জুড়ি নেই। শিশুদের তিনি বড় করতে চান রঙিন স্বপ্ন চোখে, দেশ ও জাতির ইতিহাস বুকে নিয়ে। তারা খেলবে, তারা পড়বে, তারা উড়বে, তারা ঘুরবে তাদের মতো-এটাই মারুফুল ইসলামের লক্ষ্য।

গ্রন্থে ‘ঋণ’ শিরোনামে আছে ৩টি ছড়া। আমাদের জাতীয় জীবনের অনিবার্য অস্তিত্ব ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘নজরুল’ আর ‘বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে লিখেছেন এই ৩টি লেখা। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি বলেছেন অবলীলায়:

একটা মানুষ স্বপ্ন দেখল

সোনার বাংলা গড়ার

ধরার বুকে পেলাম স্বদেশ

সত্যি গর্ব করার

বলতে পার

কার কাছে তাই ঋণী ঠ

বঙ্গবন্ধু তিনি

মারুফুল ইসলামের ছড়ার সৌন্দর্যের আরেকটি দিক হলো ছন্দ। তাঁর ছড়ার ধ্বনি-মাধুর্য এতই চমৎকার যে শোনামাত্রই তুষ্ট হয় আমাদের কান। তাঁর ছন্দ যেমন নিখুঁত, তেমনি সূক্ষ্ম। মধ্যমিলে, অনুপ্রাসে, অন্ত্যমিলে তাঁর অসাধারণত্ব ধরা দেয় তাঁর ছড়াগুলোতে। অনেক কঠিন ও দূরাগত শব্দ, শব্দবন্ধ এমনকি বাক্যাংশ দিয়ে তিনি এমন সহজ-অনায়াসে অন্ত্যমিল দিতে সক্ষম যে পাঠককে অনেক সময়ই হতবাক হয়ে যেতে হয়। যেমন:

মূর্ছনা তুই পুরোই আমার

একটুখানি অল্প না

তোকে নিয়ে তাই তো আমার

অষ্টপ্রহর জল্পনা

 

আমার লেখা ছন্দছড়া

অন্য কারুর গল্প না

এক জীবনের সত্যি পাওয়া

তিন ভুবনের কল্পনা

[তিন ভুবনের কল্পনা]

মারুফুল ইসলাম তেমন এক ছড়াশিল্পী, যিনি তাঁর রচনায় সঞ্চার করেন জাদুস্পর্শ। সাহিত্যের নানা শাখায় তার সদর্প বিচরণ হলেও ছড়াসাহিত্যেও তিনি শক্তিমান এবং অধিক স্বচ্ছন্দ।

কোয়েল চক্রবর্তী তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন-যে কোনো শ্রেণির সাহিত্যেই দুটি দিক থাকে। একটি তার বিষয়গত দিক এবং আর একটি তার রূপগত দিক। সাহিত্যে এই দুটি দিককে ঘিরেই নান্দনিকতার অন্বেষণ করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় কোনো কোনো সাহিত্যের বিষয়গত সৌন্দর্য আছে, কিন্তু রূপগত সৌন্দর্য তেমনভাবে কিছু নেই। আবার কোনো কোনো সাহিত্যের রূপগত সৌন্দর্য আছে, কিন্তু বিষয়গত সৌন্দর্য তেমন নেই। আবার এমন সাহিত্যও আছে, যেগুলোর বিষয়গত ও রূপগত সৌন্দর্য দুই-ই সমানভাবে বিদ্যমান।

মারুফুল ইসলামের ছড়ায় বিষয়গত সৌন্দর্য যেমন বিদ্যমান, তেমনি বিদ্যমান রূপগত সৌন্দর্যও। তাঁর ছড়ার মধ্যে সর্বজনীন আবেদন থাকে, শিশুকে তুষ্ট করার উপাদান থাকে এবং থাকে এমন এক অনুভূতি-যা ছড়াকে করে আকর্ষণীয়, দেয় ব্যাপ্তি।

 

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...