শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২১ পূর্বাহ্ন

বাংলা ছন্দের সহজ পাঠ : রাশেদ রউফ

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ৬০৭ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৫৭ অপরাহ্ন
বাংলা ছন্দের সহজ পাঠ : রাশেদ রউফ

বাংলা ছন্দের সহজ পাঠ
রাশেদ রউফ

-কবিতা কাকে বলে
সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীনতম শাখা হলো কবিতা। পৃথিবীর সব দেশে সব ভাষাতেই কবিতা লেখা হয়। এক কথায় কবিতার কোনো সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। কয়েকটি বাক্যে কবিতার বৈশিষ্ট্যও সব প্রকাশ করা যায় না। জগতের বিস্ময় ও অপার সৌন্দর্য মাধুরী কবিতার মধ্যে খানিকটা প্রকাশ পায় মাত্র। কাব্যরসিকরা বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা তার বাচ্যার্থ ও লক্ষ্যণার্থকে অতিক্রম করে ব্যঞ্জনার্থে উন্নীত হয় এবং রসময়তা সৃষ্টি করে। কিন্তু কাব্য রস অপার্থিব। কবিতা অলৌকিক। কবিতা লোকোত্তর আনন্দ দান করে’।
আজ পর্যন্ত কবিতার সুনির্দিষ্ট বা অভিন্ন কোনো সংজ্ঞা তৈরি হয়নি। নানা জনের দৃষ্টিতে কবিতার সংজ্ঞা নানা ভাবে আমরা পেয়েছি। কবিতা কখনও হয়েছে আবেগ কেন্দ্রিক, কখনও অনুভূতিপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ, কখনও সমকালের মুখপাত্র, কখনও শাব্দিক ঝংকার, কখনও বেদনাবিধুর হৃদয়ের আর্তি, কখনও শোকাহত হৃদয়ের আর্তনাদ, কখনও সংগ্রামী সশস্ত্র সৈনিক, কখনও-বা অধিকার বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের আত্মকথন।
এক বিশেষ মুহূর্তে নির্মিত হয় কবিতা। গদ্য যে কোনো সময় লেখা যায়, কিন্তু কবিতা লেখা যায় না। কবিতা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। জোর করে হয় না। ধস্তাধস্তি চলে না। মনের অস্থিরতাতেও কবিতা লেখা যায় না। কবিতার জন্য চাই সুস্থির মন। হৃদয়, মস্তিষ্ক, শব্দ এবং অর্থের যথার্থ মিলনের ফলেই কবিতার জন্ম হয়। প্রাচীন কালে আচার্য ভামহ বলেছিলেন- ‘শব্দার্থৌ সহিতৌ কাব্যম্’। অর্থাৎ শব্দ ও অর্থের সমন্বয়ে কাব্য বা কবিতা গড়ে ওঠে। আচার্য বামন বলেছিলেন- ‘কাব্যং গ্রাহ্যং অলংকারাং’। অর্থাৎ কাব্য বা কবিতা গ্রাহ্য হয় অলঙ্কারের দ্বারা। অলঙ্কার আবার দুই ধরনের। শব্দালঙ্কার এবং অর্থালঙ্কার। শব্দালঙ্কার কবিতাকে শব্দধ্বনিগত সৌন্দর্য দান করে আর অর্থালঙ্কার কবিতাকে অর্থগত সৌন্দর্য দান করে। কারও কারও মতে, কবিতা ছন্দবদ্ধ রচনা। নিরূপিত ছন্দে রচিত না হয়েও কবিতার মধ্যে এক ধরনের ছান্দিক সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
কবিতা আমাদের চিন্তা-চেতনাকে জাগ্রত করে, প্রেরণা দেয়। কবিতা আমাদের সৃষ্টিশীল করে। কবিতা আমাদের জীবনকে ভালবাসতে শেখায়। কবিতা আমাদের আত্মসংস্কৃতিকে ও জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কবিতা পাঠকের অন্তরঙ্গতা ও আন্তরিকতা দাবি করে।
আরো কিছু কবি, কাব্য সমালোচক এবং দার্শনিক; তাঁরা কবিতা সম্বন্ধে কী বলেন, জেনে নিই।
রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘রূপের মধ্যে অরূপের সন্ধানই কবিতা।’
বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝি না, কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না,‘বোঝানো’ যাবে না।’
ম্যাকলিশ বলেছেন, ‘কবিতা কিছু বোঝায় না; কবিতা হয়ে ওঠে।’
শেলী বলেছেন, ‘কবিতা হলো পরিতৃপ্ত এবং শ্রেষ্ঠ মনের পরিতৃপ্তি এবং শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের বিবরণ। কবিতা তখনই সার্থক হয়, যখন কবি মনের পরিতৃপ্তিতে পূর্ণতা আসে।’
রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘সেটুকুই বিশুদ্ধ কবিতা, যার অনুবাদ সম্ভব নয়।’ অন্য জায়গায় বলেছেন, ‘কবিতা হলো ‘পারফরমেনস ইন ওয়ার্ডস’’।
মেকল বলছেন, ‘কবিতা বললে আমরা বুঝি সেই শিল্প যা শব্দকে ব্যবহার করে এমনভাবে যা কল্পনার রাজ্যে জাগিয়ে দেয় এক স্বপ্ন।’
কোলরিজ বলেছেন, ‘গদ্য মানে শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো। আর পদ্য মানে সর্বোৎকৃষ্ট শব্দ সর্বোৎকৃষ্টভাবে সাজানো।’
মালার্মে বলেছেন, ‘শব্দই কবিতা।’
এডগার এলান বলেছেন, ‘কবিতা হলো সৌন্দর্যের ছন্দোময় সৃষ্টি।’
কীটস বলেছেন, ‘কবিতা মুগ্ধ করবে তার সূক্ষ্ম অপরিমেয়তায়, একটি মাত্র ঝংকারে নয়। পাঠকের মনে হবে এ যেন তারই সর্বোত্তম চিন্তা যা ক্রমশ ভেসে উঠছে তার স্মৃতিতে।’
এলিয়ট বলেছেন, ‘কবিতা রচনা হলো রক্তকে কালিতে রূপান্তর করার যন্ত্রণা।’
কার্লাইল বলেছেন, ‘কবিতা হলো মিউজিক্যাল থট।’
সেন্ট অগাস্টিন কবিতার সংজ্ঞা বিষয়ে বলেছেন, ‘যদি জিজ্ঞাসা করা না হয়, আমি জানি। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি জানি না।’
ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, ‘কবিতা সমস্ত জ্ঞানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর সূক্ষ্ম আত্না।’
জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘উপমাই কবিতা।’
হুমায়ুুন আজাদ বলেছেন, ‘যা পুরোপুরি বুঝে উঠব না, বুকে ওষ্ঠে হৃৎপিণ্ডে রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাব না; যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও, রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম কবিতা।’
সৈয়দ শামসুল হকের মতে, ‘কবিতা হচ্ছে সর্বোত্তম ভাবের সর্বোত্তম শব্দের সর্বোত্তম প্রকাশ। সর্বোত্তম ভাবের সাথে সর্বোত্তম শব্দের সংযোগই পারে সর্বোত্তম কবিতা সৃষ্টি করতে।’
সিকান্দার আবু জাফর বলেছেন, ‘আমি কবিতা লিখি অনায়াসে । যেমন সকলেরই ক্ষেত্রে জীবনের আশে-পাশে অসংখ্য সুলভ দুর্লভ মুহূর্ত নানা রূপে অনাবৃত হয়েছে আমার সামনে। আমি কোন কোন সময় সেই সব মুহূর্তের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ করেছি সত্য-বিচ্যুতি না ঘটিয়ে। সেই আমার কবিতা।’
আল মাহমুদের সংজ্ঞাটা আমরা পাই তাঁর কবিতায় :
কবিতা সে তো মক্তবের মেয়ে
চুল খোলা আয়েশা আখতার।
অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘পাখির নীড়ের সাথে নারীর চোখের সাদৃশ্য আনতে যে সাহসের দরকার সেটাই কবিত্ব।’
দার্শনিক এরিস্টটল কবিতা নিয়ে অসাধারণ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়ো।’
আসলে কবিতা এক সৃষ্টিকর্ম, তা কবির উপলব্ধিজাত বিশেষ শিল্পভাবনা। কবির মনে যা কিছু অনুরণন হচ্ছে, ভাবনার ওঠা-নামা চলছে; তাকে শিল্পে রূপদানই হলো কবিতা। এক কথায় কবির সৌন্দর্যভাবনার বহিঃপ্রকাশ। কারও কারও মতে, কবিতা হলো কবি-মনের স্থিত ভাব ও ভালোবাসার জাগরণ। এক ধরনের সদর্থক জীবনভাবনা- যা মানুষকে সতত প্রেরণা দেয়। কবিতা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, জীবনকে ভালবাসতে শেখায়। প্রতিবাদী হতে সাহায্য করে। কবিতা মানুষকে নির্মল আনন্দ দেয়, আমাদের চিন্তা-চেতনাকে জাগ্রত করে, প্রেরণা দেয়। কবিতা আমাদের সৃষ্টিশীল করে। কবিতা আমাদের আত্মসংস্কৃতিকে ও জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কবিতা পাঠকের অন্তরঙ্গতা ও আন্তরিকতা দাবি করে। কবিতা-পাঠে মন প্রাণ সমৃদ্ধ হয়।
বোদলেয়ার বলেছেন, ‘প্রত্যেক কবি অনিবার্যভাবেই সমালোচক। একজন সমালোচক কবি হয়ে উঠলে আশ্চর্য হওয়া যতটা স্বাভাবিক তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হতে হবে যদি একজন কবির মধ্যে সমালোচক জেগে না থাকে।’
কে কবি
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’।
‘কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি’।
‘কবিতার কথা’য় জীবনানন্দ দাশ অনেক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে :
১. কবিতা রসেরই ব্যাপার, কিন্তু এক ধরনের উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিঞ্জতা ও চেতনার জিনিস -শুদ্ধ কল্পনা বা একান্ত বুদ্ধির রস নয়।
২. হতে পারে কবিতা জীবনের নানারকম সমস্যার উদ্ঘাটন; কিন্তু উদ্ঘাটন দার্শনিকের মতো নয়, যা উদ্ঘাটিত হলো তা যে কোনো জঠর থেকেই হোক আসবে সৌন্দর্য রূপে।
৩. কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মরমে থাকবে পরিচ্ছন্ন কাল জ্ঞান।
এর বাইরে জীবনানন্দের যে কথাটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে, সেটি হলো ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। কবিতা লিখলেই কবি হওয়া যায় না- এমন মত পোষণ করেন তাঁর মতো অনেকেই। অন্যদিকে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, ‘কেউ কেউ কবি নয়, সকলেই কবি।’ তিনি তাঁর ‘কবিতার ক্লাশ’- এ লিখেছেন :
কবিতা লিখবার জন্য আলাদা রকমের মানুষ হবার দরকার নেই। রামা শ্যামা যদু মধু প্রত্যেকেই (ইচ্ছে করলে এবং কায়দাগুলোকে একটু খেটেখুটে রপ্ত করে নিলে) ছন্দ ঠিক রেখে, লাইনের পর লাইন মিলিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। তার জন্য, বলাই বাহুল্য, কিছু জিনিস চাই, এবং কিছু জিনিস চাই না। আগে বলি কী কী চাই না ১. কবি হবার জন্য লম্বা-লম্বা চুল রাখবার দরকার নেই। ওটা হিপি হবার শর্ত হতে পারে, কিন্তু কবি হবার শর্ত নয়। পরীক্ষা করে দেখে গেছে, চুল খুব ছোটো করে ছেঁটেও কিংবা মাথা একেবারে ন্যাড়া করে ফেলেও কবিতা লেখা যায়। চুলের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে, কবিতার নেই। ২. সর্বক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মাটির দিকে তাকিয়েও কবিতা লেখা যায়। সবচাইতে ভালো হয়, যদি অন্য কোনও দিকে না তাকিয়ে শুধু খাতার দিকে চোখ রাখেন। ৩. কখন চাঁদ উঠবে, কিংবা মলয় সমীর বইবে, তার প্রতীক্ষায় থাকবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অমাবস্যার রাত্রেও কবিতা লেখা যায়, এবং মলয় সমীরের বদলে ফ্যানের হাওয়ায় কবিতা লিখলে তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। ৪. ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবি পরবার দরকার নেই। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, স্যানডো গেঞ্জি গায়ে দিয়েও, কিংবা একেবারে আদুর গায়েও, কবিতা লেখা সম্ভব। এইবার বলি, কবিতা লিখতে হলে কী কী চাই। বিশেষ-কিছু চাই না। দরকার শুধু ১. কিছু কাগজ (লাইন-টানা হলেও চলে, না-হলেও চলে)। ২) একটি কলম (যে-কোনও শস্তা কলম হলেও চলবে) অথবা একটি পেনসিল এবং-৩. কিছু সময়। কিন্তু এতসব কথা আমি বলছি কেন? কবিতার কৌশলগুলিকে সর্বজনের হাতের মুঠোয় এনে না-দিয়ে কি আমার তৃপ্তি নেই? সত্যিই নেই। ইংরেজিতে ‘পোয়্ট্রি ফর দি কমন ম্যান’ বলে একটা কথা আছে। আমার ইচ্ছে, কমন ম্যানদেরও আমি পোয়্ট বানিয়ে ছাড়ব। পরশুরামের কথা মনে পড়ছে। তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, পৃথিবীকে একেবারে নিঃক্ষত্রিয় করে ছাড়বেন। কিন্ত, না-পারবার হেতুটা যা-ই হোক, কাজটা তিনি পারতে-পারতেও পারেননি। বিশ্বসংসারকে যাঁরা নিষ্কবি করে ছাড়তে চান (অনেকেই চান), তাঁরাও সম্ভবত শেষ পর্যন্ত পেরে উঠবেন না। আমার প্রতিজ্ঞাটা অন্য রকমের। আমি ঠিক করেছি, বাংলা দেশে সব্বাইকে আমি কবি বানাব। দেখি পারি কি না। কবিতা লিখবার জন্য কী কী চাই, তা তো একটু আগেই বলেছি। চাই কাগজ, চাই কলম (কিংবা পেনসিল), চাই সময়। তা আশা করি কাগজ-কলম আপনারা জোগাড় করতে পেরেছেন। বাকি রইল সময়। তা-ও নিশ্চয়ই আপনাদের আছে। রেশনের দোকানে লাইন না-লাগিয়ে, এই যে আপনারা গুটিগুটি ‘কবিতার ক্লাস’-এ এসে হাজির হয়েছেন, এতেই বুঝতে পারছি যে, সময়ের বিশেষ অভাব আপনাদের নেই। সুতরাং ‘দুর্গা দুর্গা’ বলে শুরু করা যাক। অয়মারম্ভঃ শুভায় ভবতু। আগেই বলি, কবিতার মধ্যে তিনটি জিনিস থাকা চাই। কাব্যগুণ, ছন্দ, মিল। বিনা ডিমে যেমন ওমলেট হয় না, তেমনই কাব্যগুণ না থাকলে কবিতা হয় না। তার প্রমাণ হিসেবে আসুন, আমার সেই মাসতুতো ভাইয়ের ছোটোছেলের লেখা চারটে লাইন শোনাই: সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে, দুর্যোধনের ভাই। গর্জনে তার তুর্য বাজে, তর্জনে ভয় পাই। বলা বাহুল্য, এটা কবিতা হয়নি। তার কারণ, ছন্দ আর মিলের দিকটা ঠিকঠাক আছে বটে, কিন্তু কাব্যগুণ এখানে আদপেই নেই। এবং কাব্যগুণ না-থাকায় দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা নেহাতই বাক্যের ব্যায়াম হয়ে উঠেছে। এবারে মিলের কথায় আসা যাক। মিল না-রেখে যে কবিতা লেখা যায় না, তা অবশ্য নয়, তবু যে আমি মিলের উপর এত জোর দিচ্ছি তার কারণ: ১) প্রথমেই যদি আপনি মিল-ছাড়া কবিতা লিখতে শুরু করেন, তাহলে অনেকেই সন্দেহ করবে যে, মিল-এ সুবিধে হয়নি বলেই আপনি অ-মিলের লাইনে এসেছেন। সেটা খুব অপমানের ব্যাপার। ২) মিল জিনিসটাকে প্রথম অবস্থায় বেশ ভালো করে দখল করা চাই। তবেই সেটাকে ছেড়ে দিয়েও পরে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব হবে। যেমন বড়ো বড়ো লিখিয়েদের মধ্যে অনেকেই অনেকসময়ে ব্যাকরণের গণ্ডির বাইরে পা বাড়িয়ে চমৎকার লেখেন, এ-ও ঠিক তেমনই। ব্যাকরণ বস্তুটাকে প্রথমে বেশ ভালো করে মান্য করা চাই, তবেই পরে সেটাকে দরকারমতো অমান্য করা যায়। ঠিক তেমনি, পরে যাতে মিলের বেড়া ভাঙা সহজ হয়, তারই জন্য প্রথম দিকে মিলটাকে বেশ আচ্ছা করে রপ্ত করতে হবে। ছন্দ কিন্তু সবসময়ই চাই। আগেও চাই, পরেও চাই।
কবিতার প্রাণ
কবিতাকে কি গান বলা যায়? বলতে কি পারি কবিতা গানের মতো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, ঢুকতে কি পারে মানুষের মস্তিষ্কে, মনে?
কবিতা গান নয়, কিন্তু গানের মতো তার সুর আছে, সে পারে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে, ঢুকতে পারে মনে, মন থেকে মনান্তরে। কাব্যাতিহাসের প্রারম্ভে কবিতা কখনও লেখা হতো না, গানের মতো সুর করে গাওয়া হতো। তাই তৎসময়ে রচিত কবিতাগুলোকে কখনও বলা হতো কবিতা, আবার এখনও বা গান। গানের আবহ থেকে কবিতাকে সরিয়ে আনার জন্য আমাদের আধুনিক কবিরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কবিতা আর গানকে চেনার অবকাশ পাচ্ছি আলাদাভাবে, স্বতন্ত্র মাধ্যম হিসেবে। তবে কবিতাকে গান এবং গানকে এখন কবিতা হিসেবে না বললেও গানের আর কবিতার উৎস, উদ্দেশ্য এবং মনকে তুষ্ট করার ক্ষমতা কিন্তু এক ও অভিন্ন।
কবিতার সংজ্ঞা গিয়ে দান্তে বলেছিলেন, ‘সুরে বসানো কথাই হলো কবিতা।’ আর সেই কবিতার কোন্ দিক আমাদের আলোড়িত করে, আমাদের অভিভূত করে, কাছে টানে? সে কি তার শব্দ, বক্তব্য, আঙ্গিক নাকি অন্য কিছু? বুন্ধদেব বসুর ভাষায়-‘আমার এক এক সময় মনে হয় যে, কবিতা যে আমাদের এমনভাবে অভিভূত ও আলোড়িত করে সে তার ধ্বনিরই প্রভাবে, অর্থ-গৌরবে নয়। আমরা দেখেছি, সুর ধ্বনির অভাবে কতো কবিতা পাঠক প্রিয়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ সেই কবিতাগুলোতে এমন বক্তব্য বা এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যা পাঠকের মগজকে নাড়া দিতে সক্ষম’। সম্পূর্ণ কবিতাটি পড়া হয়ে যাওয়ার পরেই মনের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে অপূর্ব বিষ্ময়; নিরেট আনন্দ। কিন্তু আনন্দ পাওয়ার দীর্ঘ পথটি পার হওয়ার জন্য পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা কবিতাটির মধ্যে থাকতে হবে তো! কবিতা পাঠককে ধরে রাখে তার সুরের মাধ্যমে, যাকে আমরা বলি ‘ছন্দ’। ছন্দ কবিতার প্রাণ। আমাদের বড়ো বড়ো কবি, কবিতা সমালোচকরা ছন্দকে কবিতার জামা কাপড় হিসেবে ভাবতে নারাজ। তাঁরা তাকে বলেছেন কবিতার শরীর বা অবয়ব। কিন্তু সাম্প্রতিক গদ্য কবিতার যে প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। অনেকেই যেন বোঝেন না, গদ্য লিখতে হলে বর্ণমালার জ্ঞান যেমন আবশ্যিক, তেমনি কবিতা লিখতে হলে ছন্দ জ্ঞান জরুরি। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন ‘বহুকথিত হলেও এটিকে সত্য বলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে একমাত্র ছন্দজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরই অধিকার আছে ছন্দ বর্জিত কবিতা লেখার।’ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন ‘কবি প্রতিভার একমাত্র অভিজ্ঞানপত্র ছন্দঃস্বাচ্ছন্দ্য।’
ছন্দ কাকে বলে
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘বাক্যস্থিত পদগুলিকে যেভাবে সাজাইলে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় ও তাহার মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধ হয়, পদ সাজাইবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে’।
বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ছন্দ কাব্যের গতিসৌন্দর্য বিধায়ক একটি স্বতঃস্ফূর্ত নির্মাণকৌশল। হাজার বছর ধরে বিচিত্র আবেগ, অনুভূতি ও বিষয়ভাবনা দ্বারা পরিপুষ্ট বাংলা কাব্যের গতিময় নান্দনিক সৌন্দর্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কবিরা বহুবিধ ছন্দের নির্মাণ ও বিকাশ সাধন করেছেন।
ভারতবর্ষে ছন্দচর্চার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। সুদূর অতীতে বৈদিক ভাষা ও সাহিত্য (খ্রি.পূ ২৫০০-৯০০ অব্দ) চর্চার সময়কাল থেকেই ভারতবর্ষে কাব্যের প্রধান উপাদানরূপে ছন্দের চর্চা হয়ে আসছে। ধ্রুপদী  সংস্কৃত ভাষায় রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকিকে আদি কবি এবং তাঁর কাব্যে ব্যবহূত ছন্দকে আদি ছন্দ বলেও একটা কথা প্রচলিত আছে।
এত কঠিন কথা হয়তো মাথায় ঢুকবে না। আমরা শুধু বুঝব, ছন্দ মানে সুর। ছন্দ মানে তাল।
তাল আছে বলেই পৃথিবী চলছে। সুর আছে বলেই সকল কাজ ঠিকমতো সম্পন্ন হচ্ছে। ছন্দ এমন জিনিশ, যা সহজাতভাবেই মানুষ পেয়ে যায়। ছন্দ মাতৃভাষার মতো। ছন্দ ভালোবাসার মতো। মাতৃভাষা যেমন সহজাত, ভালোবাসা যেমন সহজাত; তেমনি ছন্দও অনিবার্যভাবে মানুষের সঙ্গে থাকে। মানুষ অনেক সময় জানে না যে সে ছন্দে চলছে। ছন্দ কবিতারও প্রাণ। ছন্দোবদ্ধ কবিতা গদ্য কবিতা থেকে অনেক শ্রুতিমধুর।
বাংলা ছন্দ কত প্রকার
বাংলা ভাষায় নির্মিত কবিতার হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক ধরনের ছন্দের আমরা পরিচিত হয়েছি। তবে ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার।
১.স্বরবৃত্ত
২.মাত্রাবৃত্ত
৩. অক্ষরবৃত্ত
এছাড়া আরও দুটি রীতি চালু আছে। সেগুলি হলো :
১. গদ্যছন্দ
২. মিশ্র ছন্দ।
তিন প্রধান বা মৌল ছন্দরীতি (স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত)-এর পরে আসে গদ্য ছন্দ ও মিশ্র ছন্দ। মিশ্র ছন্দ হচ্ছে একই কবিতার বিভিন্ন পঙ্ক্তিতে বিভিন্ন ছন্দের প্রয়োগ, আর গদ্য ছন্দ হচ্ছে বাংলা ছন্দের বাঁধাধরা রীতিকে এড়িয়ে মাত্রার সমতা পর্বের সমতাকে ছুটি দেওয়া, অনেক সময় অন্ত্যমিলকে বর্জন করা। তবু গদ্যে লেখা সেই কবিতাতেও থাকবে সুর, ধ্বনি ও ঝংকার। ‘ছন্দ তো আসলে ধ্বনি ও যতির সুশৃঙ্খল বিরতি ও গতি–এই আমাদের যাত্রা শুরু, এই থামলাম, এই যাত্রা, আবার থামলাম আবার যাত্রা আবার বিশ্রাম-এই তো ছন্দ।’
ছন্দের উপাদান
ছন্দ জানার জন্য আমাদের কয়েকটি উপাদানের আশ্রয় নিতে হয়।
যেমন :
১. সিলেবল
২. মাত্রা
৩. যতি
৪. পর্ব ইত্যাদি।
এরমধ্যে সিলেবলই ছন্দ বিচারের প্রধান ভিত্তি। এগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক।
সিলেবল :
সিলেবল কাকে বলে জানতে চাইলে আমরা বলতে পারব। তবে সংজ্ঞা দিতে গেলে বলতে হয় : ‘বাকযন্ত্রের স্বল্পতম প্রচেষ্টায় উচ্চারিত ধ্বনিকে সিলেবল বলে’। কথাটাকে কঠিন বা জটিল মনে হলে আমরা সহজ করে বলব, শব্দের ক্ষুদ্রতম খণ্ডিত অংশকে সিলেবল বলে। কতটুকু খণ্ডিত অংশ? যে অংশ আর ছোটো করা যায় না, ভাঙা যায় না। যেমন : নন্দন। এটির ভেতর দুটি সিলেবল : নন্+দন্। ছলাকলা’র মধ্যে ৪টি সিলেবল : ছ+লা+ক+লা। ‘রবীন্দ্রনাথ’কে ভাঙলে সিলেবল কেমন হবে? র+বিন্+দ্র+ নাথ। ৪টি সিলেবল।
 সিলেবল দুই ধরনের।
১. মুক্ত সিলেবল বা মুক্তাক্ষর
২. বদ্ধ সিলেবল বা বদ্ধাক্ষর।
উচ্চারণে যে ধ্বনি মুক্ত থাকে, তাকে বলি মুক্তাক্ষর; যেমন ছ..+লা…+ক…+ লা..এখানে ৪টি সিলেবলই মুক্তাক্ষর; আ..+জা..+দী..এখানে ৩টি সিলেবলই মুক্তাক্ষর।
অন্যদিকে উচ্চারণের সাথে সাথে যে ধ্বনি বদ্ধ হযে যায়, তাকে বলা হয় বদ্ধাক্ষর।
যেমন :ঃ নন্+দন্, এখানে দুটি সিলেবলই বদ্ধাক্ষর।
‘যুক্তি’ এই শব্দের সিলেবল ভাগ করলে এ রকমই দাঁড়ায় ঃ যুক্+তি। এখানে ‘যুক্’ বদ্ধাক্ষর, আর ‘তি’ মুক্তাক্ষর, আনন্দন=আ+নন্+দন্, এখানে তিনটি সিলেবল। ‘আ’-মুক্তাক্ষর, নন্ ও দন্-দুটো বদ্ধাক্ষর।
তেমনি ‘রবীন্দ্রনাথ’= র+বিন্+দ্র+ নাথ। র-মুক্তাক্ষর, বিন্ – বদ্ধাক্ষর, ‘নাথ’- বদ্ধাক্ষর।
মাত্রা :
সিলেবল-এর উপর নির্ভর করে মাত্রা গণনা করা হয়।
স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি বদ্ধাক্ষর একমাত্রা এবং প্রতিটি মুক্তাক্ষর একমাত্রা।
যেমন : আনন্দন। এখানে আ+নন+দন্=তিনটি সিলেবল। আ=১ মাত্রা, নন্=১ মাত্রা, দন্=১ মাত্রা। তাহলে ‘আনন্দন’ স্বরবৃত্তে ৩ মাত্রা।
‘শিল্প’=শিল্+প। শিল্=১ মাত্রা, প=১ মাত্রা। তাহলে শিল্প=২ মাত্রা।
রবীন্দ্রনাথ=র+বিন্+দ্র+নাথ। র=এক মাত্রা, বিন=১ মাত্রা, দ্র=১ মাত্রা, নাথ=১ মাত্রা, তাহলে ‘রবীন্দ্রনাথ’ ৪ মাত্রা।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর দুই মাত্রা এবং মুক্তাক্ষর এক মাত্রা। যেমন আনন্দন=আ+নন্+দন্। আ (মুক্তাক্ষর)=১ মাত্রা, নন্ (বদ্ধাক্ষর)=২ মাত্রা, দন্ (বদ্ধাক্ষর)=২মাত্রা। তাহলে ‘আনন্দন’=৫ মাত্রা।
শিল্প=শিল্+প। শিল্=২ মাত্রা, প=১ মাত্রা। তাহলে ‘শিল্প’=৩ মাত্রা।
রবীন্দ্রনাথ=র+বীন+দ্র+নাথ। র=১ মাত্রা, বীন=২ মাত্রা, দ্র=১ মাত্রা, নাথ=২ মাত্রা। তাহলে রবীন্দ্রনাথ=৬ মাত্রা।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাতা, আর বদ্ধাক্ষর যদি শব্দের প্রথমে ও মধ্যে হয় তাহলে এক মাত্রা, যদি শব্দের শেষ থাকে, তাহলে ২ মাত্রা। যেমন : ‘আনন্দন’=আ+নন্+দন্, আ=১ মাত্রা (মুক্তাক্ষর), নন্=১ মাত্রা (বদ্ধাক্ষর, শব্দের মাঝে বলে), দন্=২ মাত্রা (বদ্ধাক্ষর, শব্দের শেষে বলে)। তাহরে আনন্দন=৪ মাত্রা।
শিল্প=শিল্+প। শিল্=১ মাত্রা (শব্দের প্রথমে বদ্ধাক্ষর বলে), প=১ মাত্রা (মুক্তাক্ষর), তাহলে শিল্প=২ মাত্রা। রবীন্দ্রনাথ=র+বিন্+দ্র+নাথ্। র=একমাত্রা (মুক্তাক্ষর), বিন=১ মাত্রা (শব্দের মাঝে বদ্ধাক্ষর বলে) দ্র=১ মাত্রা (মুক্তাক্ষর), নাথ=২ মাত্রা (শব্দের শেষে বদ্ধাক্ষর বলে), তাহলে রবীন্দ্রনাথ=৫ মাত্রা।
তাহলে কী দাঁড়ায়!
            স্বরবৃত্ত  মাত্রাবৃত্ত        অক্ষরবৃত্ত
১) আনন্দন ৩ মাত্রা   ৫ মাত্রা         ৪ মাত্রা
২) শিল্প            ২ মাত্রা   ৩ মাত্রা         ২ মাত্রা
৩) রবীন্দ্রনাথ ৪ মাত্রা   ৬ মাত্রা          ৫ মাত্রা
এক নজরে মাত্রা গণন
মুক্তাক্ষরবদ্ধাক্ষর
স্বরবৃত্ত ১ মাত্রা ১ মাত্রা
মাত্রাবৃত্ত ১ মাত্রা ২ মাত্রা
অক্ষরবৃত্ত ১ মাত্রা শব্দের শেষে ২ মাত্রা, অন্য যে কোনো জায়গায় ১ মাত্রা
যতি:
উচ্চারণে যখন বিরতি পড়ে, তখনই সৃষ্টি হয় যতি। যতি মানে বিরতি, যতি মানে ছেদ।
 যতি তিন ধরনের:
 ক. পূর্ণযতি
খ. অর্ধযতি
গ. লঘুযতি।
উচ্চারণে যখন সম্পূর্ণ বিরতি (পঙ্ক্তির শেষে) পড়ে, যখন সৃষ্টি হয় পূর্ণযতি। পূর্ণযতির মধ্যবর্তী বিরতিকে অর্ধযতি বলে এবং যতি যেখানে খুবই ক্ষীণ, সেখানে সৃষ্টি হয় লঘু যতি।
যেমন :
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
এখানে পঙ্ক্তির শেষে (আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে) পড়েছে পূর্ণ যতি। মাঝামাঝি জায়গায় (আমাদের ছোটো নদী) পড়েছে অর্ধ যতি। এবং  লঘু যতি পড়েছে ‘আমাদের’/ ‘ছোটো নদী’ / ‘চলে বাঁকে’/ ‘বাঁকে’ -এর পর। ঠিক তেমনি অন্য পঙ্ক্তিগুলিতেও যতি এমনভাবে আছে। যতি ভাগ করলে এভাবে দাঁড়ায় :
আমাদের/ ছোটো নদী /চলে বাঁকে /বাঁকে /
বৈশাখ / মাসে তার/ হাঁটু জল /থাকে।
পার হয়ে / যায় গোরু/ পার হয় / গাড়ি
দুই ধার / উঁচু তার/ ঢালু তার /পাড়ি।
এভাবে আমরা নিচের কবিতাটির যতি ভাগ করতে পারি।
থাকব নাকো / বদ্ধঘরে / দেখব এবার / জগৎটাকে /
কেমন করে / ঘুরছে মানুষ / যুগান্তরের / ঘুর্ণিপাকে।/
পর্ব:
পর্ব মানে অধ্যায়। এখানে পর্ব বলতে পঙ্ক্তির একটি অংশকে বুঝব। বলা যেতে পারে, লঘু যতি দ্বারা বিভক্ত অংশকে পর্ব পবে।
পর্ব সাধারণত তিন প্রকার:
ক. পূর্ণ পর্ব
খ. ভাঙা পর্ব
গ. অতিপর্ব।
লঘু যতি দ্বারা বিভক্ত অংশ মানে পর্ব। অঅর পর্ব মানে প্রথম আমরা ধরে নেব পূর্ণ পর্ব। পূর্ণ পর্ব ভেঙে গেলে তখন তাকে বলা হয় ভাঙা পর্ব। বাংলা কবিতায় সাধারণত পঙ্ক্তির শেষে ভাঙা পর্ব এবং পঙ্ক্তির আগে অতিপর্ব বসে।
যেমন: মেঘের কোলে/রোদ হেসেছে/বাদল গেছে/টুটি।
এখানে তিনটি পূর্ণ পর্ব ও ১টি ভাঙা পর্ব রয়েছে। ‘টুটি’ ভাঙা পর্ব, অন্যগুলো পূর্ণ পর্ব, অতিপর্ব এ পঙ্ক্তিতে নেই।
যখন/ রুক্ষ দুপুর/দুঃখ হয়ে/মাথার উপর/ভাসে
       সকল ছেলে/ঘুমিয়ে থাকে/মা’র আঁচলের/পাশে।
এখানে ‘যখন’ অতিপর্ব, ‘ভাসে’ ও ‘পাশে’ ভাঙাপর্ব; অন্যগুলো পূর্ণপর্ব।
আমি মেঘনা পাড়ের/ছেলে
আমি/মেঘনা নদীর/নেয়ে।
এখানে ‘আমি’ অতিপর্ব, ‘ছেলে’ আর ‘নেয়ে’ ভাঙা পর্ব এবং অন্যগুলো পূর্ণপর্ব।
তেমনি আরো কয়েকটি উদাহরণ :
আমার মাটি/ শ্যামল মাটি/ সোনার চেয়ে /খাঁটি
এই মাটিতে /কারা করে /উৎপীড়নের / ঘাঁটি।
[রহীম শাহ]
অথবা,
রাস্তাটা এঁকে বেঁকে /একা একা চলে
দুপাশে বৃক্ষ আছে /নিজের দখলে।
পাখিরাও গান গায় /গাছের শাখায়
ছুটিমাখা সকালের/ রোদ আসে গায়।
[রাশেদ রউফ]
অথবা,
পেরিয়ে এলাম /ছেলেবেলা/ সে-কোন শ্রাবণ/ দিনে
তবুও এখন/ বিষ্টি এলে/
মন হয়ে যায়/ এলেবেলে/
চোখ মেলে চায় /ছোট্ট নদী,/ সেও রেখেছে /চিনে;
আমাকে সে /জড়িয়ে রাখে /ভালোবাসার/ ঋণে।
[অরুণ শীল]
স্বরবৃত্ত ছন্দ : বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ
স্বরাঘাত প্রধান, বলপ্রধান, শ্বাসাঘাত প্রধান, স্বরান্তিক, দলবৃত্ত ইত্যাদি নামে বিভিন্ন জনের কাছে ছন্দটি পরিচিত হলেও আমরা তাকে ডাকছি স্বরবৃত্ত নামে। নামটি দিয়েছেন প্রবোধ চন্দ্র সেন। বুদ্ধদেব বসু এ ছন্দকে বলতেন ‘ছড়ার ছন্দ’, রবীন্দ্রনাথ ‘প্রাকৃত বা লোক ছন্দ’ আর সত্যেন্দ্র নাথ বলতেন ‘চিত্রা’। একে ইংরেজিতে বলা হয় ঝঃৎবংংবফ গবঃৎব বা ঝুষষধনরপ গবঃৎব। যে নামেই ডাকুন না কেন, স্বরবৃত্তই সর্বাধিক পরিচিতি।
বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, বাংলা ভাষা ও বাঙালির ধ্বনি উচ্চারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছন্দ হচ্ছে স্বরবৃত্ত ছন্দ। এর কারণ, বাংলা শব্দ স্বভাবগতভাবেই হলন্ত বা ব্যঞ্জনান্ত উচ্চারণ প্রক্রিয়াবিশিষ্ট, যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘হসন্তের ছাঁচ’। এ বৈশিষ্ট্য স্বরবৃত্ত ছন্দে রক্ষিত হয়েছে। চলিত বা প্রাকৃত বাংলার স্বভাব রক্ষা করে এ ছন্দের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। ফলে এ ছন্দকে সাধু বাংলার বাইরে বাউল গানে, লোককথায় ও ছড়ায় খুঁজে পাওয়া যায়।
অনেকের মতে, আধুনিক স্বরবৃত্ত ছন্দ মধ্যযুগীয় কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ধামালি ছন্দ থেকে উদ্ভূত, কেননা ধামালিকাব্য নামে পরিচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ধামালি ছন্দে স্বরবৃত্তের পূর্ববর্তী রূপটি পরিলক্ষিত হয়। এ কাব্যের শব্দে যেহেতু হসন্ত উচ্চারণ নেই এবং অকারান্ত শব্দ অকারান্ত রূপেই উচ্চারিত হয়, সেহেতু পর্বের আদিতে শ্বাসাঘাত স্পষ্ট না হলেও তার ইঙ্গিত আছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে এমন কতগুলি  তৎসম শব্দ আছে যেগুলির আদিতে শ্বাসাঘাতের অস্তিত্ব লক্ষণীয়, যেমন: আসুখ (অসুখ), আনল (অনল), আন্তর (অন্তর), আধিক (অধিক) ইত্যাদি। মূলত উপর্যুক্ত শব্দগুলির আদিস্বরের বৃদ্ধি প্রবল শ্বাসাঘাতের জন্যই সম্ভব হয়েছে। তাই আদি স্বরের এ বৃদ্ধি দ্বারাই শব্দের আদি শ্বাসাঘাতকে বুঝে নিতে হয়, যা স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বাংলা ভাষায় আদিতম ছন্দ ‘স্বরবৃত্ত’। এটি দ্রুত লয়ে চলে। দ্রুত তালের উচ্চারণেই এর ঝঙ্কার ফুটে ওঠে। হালকা বিষয়ব¯‘ই এ ছন্দে সার্থক ভাবে রূপায়িত হয়। ইতোমধ্যে বলা হয়েছে যে, এ ছন্দে যুক্তাক্ষর এক মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষরও এক মাত্রা ধরা হয়। যেমন আনন্দন। একে সিলেবল ভাগ করে দাঁড়ায় ঃ আ+নন্+দন্। এখানে আ মুক্তাক্ষর (যে ধ্বনিতে উচ্চারণের শেষে মুখ খোলা থাকে) এবং নন্ ও দন্ বদ্ধাক্ষর (উচ্চারণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেটি বন্ধ হয়ে যায়)। সুতরাং আনন্দন=৩ মাত্রা। স্বরবৃত্ত ছন্দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর মূলপর্বগুলো সাধারণত চারমাত্রার হয়। অর্থাৎ প্রতিটি পর্বে চারটি মাত্রা থাকে। যেমন,
আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি   ডাকি।
এখানে আন্ডার লাইন করা ‘আমি হব’ ‘সকাল বেলার’ সবার আগে ‘কুসুম বাগে’ ‘উঠব আমি’-এক একটি পূর্ণ পর্ব। ‘পাখি’ ও ‘ডাকি’ ভাঙা পর্ব। প্রথম লাইনে ২টি পূর্ণ পর্ব এবং দ্বিতীয় লাইনে ৩টি পূর্ণ পর্ব বিদ্যমান। ৩টি কেন ৩০টি পূর্ণ পর্ব থাকলেও স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রতি পর্বে সাধারণত চার মাত্রা থাকা চাই।
‘আমি হব’ পর্বে দেখা যায়, আমি = আ + মি = ২ মাত্রা, হব = হ + বো = ২ মাত্রা,
অর্থাৎ ‘আমি হব’ ৪ মাত্রা।
‘সকাল বেলার’ পর্বে দেখি, সকাল = স + কাল্ = ২ মাত্রা, বেলার = বে + র্লা = ২ মাত্রা, অর্থাৎ ‘সকাল বেলার’ ৪ মাত্রা।
ঠিক সে রকম অন্যান্য পর্বেও ৪ মাত্রা দেখা যায়।
স্বরবৃত্ত ছন্দের আরো কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক :
মেঘের কোলে/রোদ হেসেছে/বাদল গেছে/টুটি,
আজ আমাদের/ছুটি ও ভাই/আজ আমাদের /ছুটি।
এখানে টুটি ও ছুটি ভাঙা পর্ব, আর সবগুলো হচ্ছে পূর্ণ পর্ব। প্রথম পর্বে দেখি ঃ মে + র্ঘে = ২ মাত্রা, কো+লে=২ মাত্রা, অর্থাৎ মেঘের কোলে ৪ মাত্রা। ‘রোধ হেসেছে’ ৪ মাত্রা ‘বাদল গেছে’ ৪ মাত্রা।
এরকম প্রতিটি পূর্ণ পর্বে ৪ মাত্রা বিদ্যমান।
আরো কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক-
রাত্রি নামে।/ক্যালেণ্ডারের/পাতা
চক্ষু বোজে।/পুষ্পেরা সব/জাগে।
কনক আপা/ডাক দিয়ে যায়/আজও
একটি বালক/ঝাপসা অনু/রাগে।
(ময়ুখ চৌধুরী)
সেই যে খোকন/বেরিয়ে গেছে/আর ফেরে নি/ঘরে
থেকে থেকে/মনটা মায়ের/কেমন কেমন/করে।
(লুৎফর রহমান রিটন)
কোথায় আমার/ঢাল তলোয়ার/কোথায় ধনুক/তীর,
মাগো আমি/যুদ্ধে যাবো/সাজব তিতুমীর।
(সুজন বড়ুয়া)
কলম তুমি/নজরুলেরই/বাণী
সঠিক পথের/অপূর্ব হাত/ছানি
তুমি যেন/সত্যেরই বট/পাকুড়
কলম তুমি/রবীন্দ্রনাথ/ঠাকুর।
(রাশেদ রউফ)
স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রত্যেক পূর্ণ পর্ব চার মাত্রার হয় বলে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এ ছন্দকে বলেছেন ‘চারের ঘরানা ছন্দ’। দেখা যাবে, এ ছন্দে লিখিত প্রতিটি লেখাই এক ধরনের চালে চলবে। তবে ব্যতিক্রম যে একেবারেই হয় না, তা নয়? অনেক সময় ৪ মাত্রার পর্বে তিন মাত্রাও দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ৫ মাত্রাও। এ ব্যাপারে ছান্দসিকদের বক্তব্য হচ্ছে, “ছন্দটা হলো কবিতার সুরের বা তালের একটা সূত্র। এ সূত্র যে একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। একমাত্রা কমলে বা বাড়লেও যদি ছন্দের বা সুরের বা তালের যদি কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।” তবে এক্ষেত্রে কবির মুন্সিয়ানাই ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। এবার কয়েকটি উদাহরণ দেয়া ডাক, যেগুলোর পর্বে ৪ মাত্রার বদলে ৫ মাত্রা বা ৩ মাত্রা বিদ্যমান।
যমুনাবতী/সরস্বতী/কাল যমুনার/ বিয়ে।
এখানে যমুনাবতী=য + মু + না + বা + তী = ৫ মাত্রা।
তোমায় ভালো/বেসেছি আমি/তাই
শিশির হয়ে/থাকতে যে ভয়/পাই।
এখানে ‘বেসেছি আমি’= ৫ মাত্রা [বে+সে+ছি=৩ মাত্রা, আ + মি = ২ মাত্রা] যদিও অন্য পূর্ণ পর্বে ৪ মাত্রা ঠিকই আছে।
ছেলে ঘুমালো/পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো/দেশে
বুলবুলিতে/ধান খেয়েছে/খাজনা দেব/কিসে?
এখানে ‘ছেলে ঘুমালো’ ও ‘পাড়া জুড়ালো’ পর্বে এক মাত্রা করে বেশি আছে। অর্থাৎ ৪ মাত্রার স্থলে ৫ মাত্রা বিদ্যমান।
থৈ থৈ থৈ/অন্ধকারে/ঝাউয়ের শাখা/দোলে,
সেই/অন্ধকারে/শন্ শন্ শন্/আওয়াজ শুধু/তোলে।
এখানে ‘সেই’ অতি পর্ব, ‘দোলে’ ও ‘তোলে’ ভাঙা পর্ব, অন্যগুলো পূর্ণ পর্ব। কিন্তু ‘থৈ থৈ থৈ’ ও ‘শন্ শন্ শন্’ এদুটি পর্বে দেখা যায় তিনটি করে মাত্রা।
[থৈ + থৈ + থৈ = ৩ মাত্রা, শন্ + শন্ + শন্ = ৩ মাত্রা]
এখানে তিন মাত্রা হলেও সুরের বা ছন্দের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং এখানে আরেকটি মাত্রা যদি বেশি থাকতো, তাহলেই ছন্দ বিপর্যয় ঘটতো। এক্ষেত্রে ছান্দসিকদের বক্তব্য হচ্ছে, যদি পাশাপাশি দুটো বদ্ধাক্ষর থাকে, তাহলে তিন মাত্রা দিয়ে পর্ব গঠন করতে হয়। শন্ শন্ পাশাপাশি রয়েছে দুটো বদ্ধাক্ষর, তাই আরেকটি বদ্ধাক্ষর শন্ দিয়ে পর্ব গঠন করতে হয়েছে।
এ বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ :
বৃষ্টি পড়ে/টাপুর টুপুর/নদে এলো/বান
শিব ঠাকুরের/বিয়ে হচ্ছে/তিন কন্যে/দান।
এখানে তিন কন্যে=তিন + কন্ + নে = ৩ মাত্রা।
‘তিন কন্-এ দুটো বদ্ধাক্ষর পাশাপাশি অবস্থান করছে বলে ৩ মাত্রা দিয়ে পর্ব গঠন করতে হয়েছে।
প্রীতিলতা/নাম শুনেছ/সে যে আমার/বোন
রঙতুলিতে/দেশ আঁকতো/আকতো ঘর/উঠোন
এখানে প্রতি পূর্ণ পর্বে চার মাত্রা থাকলেও ‘দেশ আঁকতো’ পর্বে রয়েছে তিন মাত্রা। [দেশ আঁকতো = দেশ্ + আঁক্ + তো = ৩ মাত্রা] দেশ ও আঁক্ দুটো বদ্ধাক্ষর পাশাপাশি রয়েছে বলে তিন মাত্রা দিয়ে পর্ব গঠন করতে হয়েছে।
‘মায়ের বোনের/ সম্মান আর/ শহিদ ছেলের/ দান
এই আমাদের/ পতাকা আর/ এই আমাদের/ গান।’
এখানে ‘সম্মান আর’ পর্বে তিন মাত্রা (সম+মান+আর)। পাশাপাশি দুটো বদ্ধাক্ষর বসেছে বলে তিন মাত্রা দিয়ে পর্ব গঠন করতে হয়েছে।
এখানে আরেকটি কথা উল্লেখ করতে হয়। কিছু কিছু শব্দ আছে, ‘য়ে’ যুক্ত শব্দ; যেগুলি ৩ মাত্রা হিসেবে গণনা করা হয়। আবার কবি ইচ্ছে করলে ২ মাত্রাও ধরতে পারেন। যেমন : ‘হারিয়ে’, ‘ছাড়িয়ে’, ‘দাঁড়িয়ে’, ‘বুলিয়ে’ প্রভৃতি। একটা কবিতার উদাহরণ টানছি :
নারকেলের ওই লম্বা মাথায় হটাৎ দেখি কাল
ডাবের মত চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিম ধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ?
দরগাতলা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয়
কোথেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিলো আয় আয়।
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লালদিঘির ওই পাড়
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার।
আমায় দেখে কলকলিয়ে দিঘির কালো জল
বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল
পকেট থেকে খোলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ
রক্তজবার ঝোঁপের কাছে কাব্য হবে আজ।
দিঘীর কথা উঠল হেসে ফুল পাখিরা সব
কাব্য হবে, কাব্য কবে জুড়লো কলরব।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।
[পাখির কাছে ফুলের কাছে / আল মাহমুদ]
‘পেরিয়ে গেলাম’ এবং ‘দাঁড়িয়ে আছেন’ -এই পর্বে দেখা যাবে ৫ মাত্রা করে আছে। কিন্তু পেরিয়ে এবং দাঁড়িয়ে- কে ২ মাত্রা হিসেবে গুণেছেন কবি। তাই এই পর্বে ৪ মাত্রা করে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ‘হাত বুলিয়ে’ ৪ মাত্রা। বুলিয়ে কে ৩ মাত্রা গুণেছেন তিনি।
একই কবির আরেকটি কবিতা ‘নোলক’। সেখানেও দেখা যায় এই বিন্যাস:
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
…………………………………………
জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক
সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকমিক
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরেক যেতে চাই।
কোথায় পাব তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন
আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।
সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি না তো।
ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো-
বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক।
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।
এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাব না।
এ কবিতার অনেকগুলো পর্বে ‘য়ে’ যুক্ত শব্দ আছে। এগুলোর কোনোটি ৩ মাত্রা আবার কোনোটি ২ মাত্রা হিসেবে গণনা করেছেন কবি।
তবে স্বরবৃত্তে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সুর এনেছেন নজরুল। লিচুচোর কবিতায় তিনি স্বরবৃত্তকে উপস্থাপন করেছেন ভিন্নভাবে।
বাবুদের/তাল-পুকুরে/
হাবুদের/ডাল কুকুরে
সে কি বাস/করলে তাড়া/
বলি থাম/একটু দাঁড়া
পুকুরের/ওই কাছে না/
লিচুর এক/গাছ আছে না….।
এখানে ৩+৪, ৩+৪, করে কবিতাটি এগিয়ে গেছে। স্বরবৃত্ত ছন্দে এটা ব্যতিক্রমী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এরকম ছন্দের আরেকটি কবিতার উদাহরণ দেই :
শহরের/প্রান্তসীমা/
ছাড়িয়ে/শ্যামলিমা/
যেখানে/হাতছানি দেয়/
যেখানে/আকাশ ছোঁয়া/
পাহাড়ের/শিশির ধোঁয়া/
বাতাসও/মন কেড়ে নেয়।
স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা কিছু কবিতা
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিনের আলো নিবে এল সুয্যি ডোবে ডোবে।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।
মন্দিরেতে কাঁসর ঘন্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।
ও পারেতে বিষ্টি এল, ঝাপসা গাছপালা।
এ পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা।
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান–
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান ॥
আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা, কোথায় বা সীমানা–
দেশে দেশে খেলে বেড়ায়, কেউ করে না মানা।
কত নতুন ফুলের বনে বিশিষ্ট দিয়ে যায়,
পলে পলে নতুন খেলা কোথায় ভেবে পায়!
মেঘের খেলা দেখে কত খেলা পড়ে মনে,
কত দিনের লুকোচুরি কত ঘরের কোণে!
তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান–
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান॥
মনে পড়ে ঘরটি আলো, মায়ের হাসিমুখ–
মনে পড়ে মেঘের ডাকে গুরুগুরু বুক।
বিছানাটির একটি পাশে ঘুমিয়ে আছে খোকা,
মায়ের পরে দৌরাত্মি সে না যায় লেখাজোকা।
ঘরেতে দুরন্ত ছেলে করে দাপাদাপি–
বাইরেতে মেঘ ডেকে ওঠে, সৃষ্টি ওঠে কাঁপি।
মনে পড়ে মায়ের মুখে শুনেছিলেম গান–
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান॥
মনে পড়ে সুয়োরানী দুয়োরানীর কথা,
মনে পড়ে অভিমানী কঙ্কাবতীর ব্যথা।
মনে পড়ে ঘরের কোণে মিটিমিটি আলো,
চারি দিকের দেয়াল জুড়ে ছায়া কালো কালো।
বাইরে কেবল জলের শব্দ ঝু–প্ ঝু–প্ ঝুপ–
দস্যি ছেলে গল্প শোনে, একেবারে চুপ।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে মেঘলা দিনের গান–
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান ॥
কবে বিষ্টি পড়েছিল, বান এল সে কোথা–
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো কবেকার সে কথা!
সেদিনও কি এমনিতরো মেঘের ঘটাখানা!
থেকে থেকে বাজ-বিজুলি দিচ্ছিল কি হানা!
তিন কন্যে বিয়ে করে কী হলো তার শেষে!
না জানি কোন্ নদীর ধারে, না জানি কোন্ দেশে,
কোন্ ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গানদ
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান॥
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা / শামসুর রাহমান
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি
গোলাপ নেব।
গুলবাগিচা বিরান বলে, হরহামেশা
ফিরে যাব,
তা’হবে না দিচ্ছি বলে।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি
গোলাপ নেব।
ফিরতে হ’লে বেলাবেলি হাঁটতে হবে
অনেকখানি।
বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে ফুচকি মারে
আজব পাখি।
পক্ষী তুমি সবুর করো,
শ্যাম-প্রহরে ডোবার আগে, একটু শুধু
মেওয়া খাব।
…………
তালসুপুরি গাছের নিচে, সন্ধ্যা নদীর
উদাস তীরে,
শান-বাঁধানো পথে পথে, বাস ডিপোতে,
টার্মিনালে,
কেমন একটা গন্ধ ঘোরে।
আর পারি না, দাও ছড়িয়ে পদ্মকেশর
বাংলাদেশে।
ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি
লাশ নেব না।
নই তো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে
সোনার মেডেল,
শিউলিফোটা সকাল নেব।
ঘাতক তুমি বাদ সেধো না, এবার
আমি গোলাপ নেব।
মাঠ মানে ছুট/কার্তিক ঘোষ
মাঠ মানে কি মজাই শুধু মাঠ মানে কি ছুটি….
মাঠ মানে কি অথৈ খুশির অগাধ লুটোপুটি!
মাঠ মানে কি হল্লা শুধুই মাঠ মানে কি হাসি….
মাঠ মানে কি ঘুম তাড়ানো মন হারানো বাঁশি!
মাঠ মানে কি নিকেল করা বিকেল আসা দিন,
মাঠ মানে কি নাচনা পায়ের বাজনা তাধিন ধিন!
মাঠ মানে তো সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ–
মাঠ মানে ছুট এগিয়ে যাবার–পিপির পিপির পিপ।
ছুট মানে কি ছোটাই শুধু ছুট মানে কি আশা…
ছুট মানে কি শক্ত পায়ের পোক্ত কোন ভাষা।
ছুট মানে কি সাহস শুধু ছুট মানে কি বাঁচা,
ছুট মানে কি ছোট্ট পাখির আগল ভাঙা খাঁচা!
ছুট মানে কি ছুটন্ত আর ফুটন্ত সব প্রাণে…
সাতটি সবুজ সমুদ্দুরের ঢেউকে ডেকে আনে!
ছুট মানে তো জীবন এবং ছুট মানে যে সোনা…
ছুট মানে কি ছুটেই দেখ–আর কিছু বলব না।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি/ ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
তোমার নামে অশ্রু ঘামে রক্তে থামে যজ্ঞ ঘোড়া
তোমার নামে শহর গ্রামে ডাইনে বামে ফুলের তোড়া
তোমার নামে হৃদয় ধামে বৃষ্টি নামে তাকুড়্-নাকুড়্
তোমার নামে দু॥খের দামে সুখের খামে লিখছি ঠাকুর॥
তোমার গানে স্রোতের টানে সাগর পানে ছুটছি ফিসন্
তোমার গানে তুলির টানে সবাই জানে তেজ কি ভীষণ
তোমার গানে সাহস আনে ভয় কি প্রাণে গুণ্ডা-ডাকুর-
তোমার গানে খুশির ঘ্রাণে বাঁচার মানে বুঝছি ঠাকুর॥
তোমার সুরে ভুবন জুড়ে বেড়ায় উড়ে প্রীতির পাখী
তোমার সুরে শত্রু ঘুরে হিংসা ছুঁড়ে পরায় রাখী।
তোমার সুরে কাটছে আঁধার দিদির দাদার বাবার কাকুর–
তোমার সুরে সামনে-দূরে অচিন্ পুরে ঘুরছি ঠাকুর॥
মেঘবালিকার জন্য রূপকথা / জয় গোস্বামী
আমি যখন ছোটো ছিলাম
খেলতে যেতাম মেঘের দলে
একদিন এক মেঘবালিকা
প্রশ্ন করল কৌতূহলে
“এই ছেলেটা
নাম কী রে তোর?”
আমি বললাম,
“ফুসমন্তর!”
মেঘবালিকা রেগেই আগুন,
“মিথ্যে কথা। নাম কি অমন
হয় কখনও?”
আমি বললাম,
“নিশ্চয়ই হয়। আগে আমার
গল্প শোনো।”
সে বলল, “শুনব না, যা–
সেই তো রানি, সেই তো রাজা
সেই তো একই ঢালতলোয়ার
সেই তো একই রাজার কুমার
পক্ষিরাজে–
শুনব না আর।
ওসব বাজে।”
আমি বললাম, “তোমার জন্য
নতুন ক’রে লিখব তবে।”
সে বলল, “সত্যি লিখবি?
বেশ তা হলে
মস্ত করে লিখতে হবে।
মনে থাকবে?
লিখেই কিন্তু আমায় দিবি।”
আমি বললাম, “তোমার জন্য
লিখতে পারি এক পৃথিবী।”
লিখতে লিখতে লেখা যখন
সবে মাত্র দু-চার পাতা
হঠাৎ তখন ভুত চাপল
আমার মাথায়–
খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম
ছোটবেলার মেঘের মাঠে
গিয়েই দেখি চেনা মুখ তো
একটিও নেই এ-তল্লাটে
একজনকে মনে হলো
ওরই মধ্যে অন্যরকম
এগিয়ে নিয়ে বলি তাকেই!
“তুমিই কি সেই? মেঘবালিকা
তুকি কি সেই?”
সে বলছে, “মনে তো নেই
আমার ওসব মনে তো নেই।”
আমি বললাম, “তুমি আমায়
লেখার কথা বলেছিলে–”
সে বলল, “সঙ্গে আছি?
ভাসিয়ে দাও গাঁয়ের ঝিলে!
আর হ্যাঁ, শোনো–একন আমি
মেঘ নই আর, সবাই এখন
বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়।”
বলেই হঠাৎ এক পশলায়–
চুল থেকে নখ–আমায় পুরো
ভিজিয়ে দিয়ে–
অন্য অন্য
বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে
মিলিয়ে গেল খরস্রোতায়
মিলিয়ে গেল দূরে কোথায়
দুরে দুরে…
“বুষ্টি বলে ডাকে আমায়
বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়–”
আপন মনে বলতে বলতে
আমি কেবল বসে রইলাম
ভিজে একশা কাপড়জামায়
গাছের তলায়
বসে রইলাম
বৃষ্টি নাকি মেঘের জন্য
এমন সময়
অন্য একটি বৃষ্টি আমায়
চিনতে পেরে বলল, “তাতে
মন খারাপের কী হয়েছে!
যাও ফিরে যাও–লেখো আবার।
এখন পুরো বর্ষা চলছে
তাই আমরা সবাই এখন
নানান দেশে ভীষণ ব্যস্ত।
তুমিও যাও, মন দাও গে
তোমার কাজে–
বর্ষা থেকে ফিরে আমরা
নিজেই যাব তোমার কাছে।”
এক পৃথিবী লিখব আমি
এক পৃথিবী লিখব বলে
ঘর ছেড়ে সেই বেরিয়ে গেলাম
ঘর ছেড়ে সেই ঘর বাঁধলাম
গহন বনে
সঙ্গী শুধু কাগজকলম
একাই থাকব। একাই দুটো
ফুটিয়ে খাব–
দু-এক মুঠো
ধুলো বালি–যখন যারা
আসবে মনে
তাদের লিখব
লিখেই যাব!
এক পৃথিবীর একশোরকম
স্বপ্ন দেখার
সাধ্য থাকবে যে-রূপকথার–
সে-রূপকথা আমার একার।
ঘাড় গুঁজে দিন
লিখতে লিখতে
ঘাড় গুঁজে রাত
লিখতে লিখতে
মুছেছে দিন–মুছেছে রাত
যখন আমার লেখবার হাত
অসাড় হলো,
মনে পড়ল
সাল কি তারিখ, বছর কি মাস
সে সব হিসেব
আর ধরিনি
লেখার দিকে তাকিয়ে দেখি
এক পৃথিবী লিখব বলে
একটা খাতাও
শেষ করিনি।
সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে
বৃষ্টি এল খাতার উপর
আজীবনের লেখার উপর
বৃষ্টি এল এই অরণ্যে
বাইরে তখন গাছের নীচে
নাচছে ময়ুর আনন্দিত
এ-গাছ ও-গাছ উড়ছে পাখি
বলছে পাখি, “এই অরণ্যে
কবির জন্য আমরা থাকি।”
বলছে ওরা, “কবির জন্য
আমরা কোথাও আমরা কোথাও
আমরা কোথাও হার মানিনি–”
কবি তখন কুটির থেকে
তাকিয়ে আছে অনেক দূরে
বনের পরে, মাঠের পরে
নদীর পরে
সেই যেখানে সারাজীবন
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে
সেই যেখানে কেউ যায়নি
কেউ যায় না কোনোদিনই–
আজ সে কবি দেখতে পাচ্ছে
সেই দেশে সেই ঝরনাতলায়
এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়
সোনায় মোড়া মেঘহরিণী–
কিশোরবেলার সেই হরিণী!
মাঠ মানে তো অনেক কথা-স্বাধীনতা / রাশেদ রউফ
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
আমি এখন এই শহরে ফ্ল্যাটবন্দি, শুধু মন দিই পড়ালেখায়।
বাবাও শেখায়, মাও শেখায়।
যাই প্রতিদিন পাঠশালাতে। মাঠ কোথা পাই খেলার জন্য!
অন্য কোথাও যাওয়া মানা। ডানা মেলে ফুড়ুৎ করে
উড়তে আমার ইচ্ছে করে।
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
তোমার কথায় আকুলতা বাড়ায় বুকে। মনটা হারায় অনেক দূরে।
অচিনপুরে। আমার চোখে স্বপ্নে তো নয়, সূর্যালোকে
ভাসতে থাকে আমারই গ্রাম। হাসতে থাকে পুকুর-ডোবা।
পায় তো শোভা কচুরিপানায় বেগুনি ফুল। তেতুঁল গাছের নিচে নিচে
নেবুপাতার আগে-পিছে ছুটতে থাকে নরম হাওয়া। যায় কি পাওয়া
গোবর-গন্ধ? দমবন্ধ গরম কালে ডাবের জলে শান্তি আসে
কি শরীরে, কি অন্তরে,
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
কাচের মতো সেন পুকুরের কাতলা মাছের পেটের মতো
স্বচ্ছ সাদা বকের ঝাঁকে
আটকে থাকে আমার এ মন। নদীর বাঁকে যখন তখন
তাদের এমন লাফিয়ে ওঠা,
সামনে ছোটোা অবাক লাগে। প্রাণটা জাগে।
মনটা ওঠে নড়েচড়ে।
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাঠ তুমি তো অনেক বড়ো-
আমার মতো জড়সড় খোকাটি নও, বোকাও নও। তুমি তো বেশ শান্ত উদার,
দুপাশ দুধার আনন্দ আর সুখের ঘাঁটি-
সোনায় খাঁটি রুপোয় খাঁটি তোমার বুকের নরম মাটি।
সে-সুখ যেন হারিয়ে গেলো ঠিকই এখানে, এই শহরে,
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে।
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
তোমার বুুকে মনের সুখে সব খেলা যায়। ঝক্কি ছাড়াই।
ফুটবল কি দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট কি কানামাছি। নিকেল করা টানা বিকেল
ডাংগুলি বা বৌচি খেলার মতো অনেক খেলার কথা বাদই দিলাম
কিন্তু ভারি স্বাদ পাওয়া যায় অন্যরকম। যখন আমি ঘুড়ি উড়াই
নাটাই ঘুরাই। তোমার মতো অমন বন্ধু কে হয় বলো?
দুচোখই হয় ছলোছলো তোমার কথা পড়লে মনে।
এই শহরে সে-সুখ যেন হারিয়ে গেলো তেপান্তরে,
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাঠ মানে তো সবাই জানে-গানে গানে মেতে ওঠা, ছুটতে থাকা
ঘোড়ার মতো, ফুটতে থাকা ভোরের মতো,
দুরন্ত ঢেউ, উড়ন্ত মেঘ। মাঠ মানে তো অনেক কথা-স্বাধীনতা-
মন আনচান-সুখ অফুরান।
হারিয়ে গেল জাম্বুরি মাঠ, আনন্দ-হাট, চড়ুইভাতি। মাতামাতি।
মাঠের জন্য মনটা কেমন কেমন করে,
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাঠ তোমাকে মনে পড়ে!
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ : বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ
স্বরবৃত্ত ছন্দের মতো মাত্রাবৃত্ত ছন্দেরও অনেক নাম। কিন্তু ‘মাত্রাবৃত্ত’ই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বাংলা কাব্যে ব্যবহূত অন্যতম প্রাচীন ছন্দ। এ ছন্দ চর্যাপদে  প্রথম লক্ষিত হয়। গবেষকদের মতে, মূলত মাত্রাবৃত্ত একটি সর্বভারতীয় ছন্দ এবং সংস্কৃত ও প্রাকৃতের সময় থেকেই এটি ভারতবর্ষে প্রচলিত। বাংলা ভাষায় এটি প্রবেশ করেছে  প্রাকৃত ও  অপভ্রংশ কবিতা এবং সংস্কৃত কাব্য  গীতগোবিন্দম্-এর মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করেছেন যে, এ ছন্দের সৃষ্টি হয়েছে সংস্কৃত ছন্দকে বাংলায় ভেঙে নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে এ ছন্দকে ধ্বনিপ্রধান, বিস্তারপ্রধান, সরল কলামাত্রিক ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়।
এই ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষর দুই মাত্রা। স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : এছন্দে রচিত কবিতার প্রতিটি পূর্ণ পর্ব চার মাত্রায় হয়। কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে সে রকম বৈশিষ্ট্য নেই। এই ছন্দে চারমাত্রা দিয়েও পর্ব গঠন করা যায়, ৫ মাত্রা, ৬ মাত্রা, ৭ মাত্রা, ৮ মাত্রা দিয়েও পর্ব গঠন করা যায়। কিন্তু একটি কবিতায় একটিমাত্র পর্ব ভাগের নিয়মই পালিত হয়। অর্থাৎ কবিতাটির প্রথম পূর্ণ পর্ব যদি চার মাত্রা দিয়ে শুরু হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত চার মাত্রার পর্ব দিয়ে শেষ করতে হবে। আগাগোড়া একই রীতিই অনুসরণ করতে হবে।
অর্থাৎ গোটা কবিতার প্রতিটি পূর্ণ পর্বেই সমতা থাকতে হবে। সেরকম সব ক্ষেত্রেই। পাঁচ মাত্রার ছন্দ হলে প্রতিটি পর্বে পাঁচ মাত্রা থাকা চাই। আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বরবৃত্ত কখনও কখনও তিন মাত্রা আবার কখনও পাঁচ মাত্রায় পর্ব গঠন করা যায়, যদিও তাতে চার মাত্রা দিয়েই পর্ব গঠন করার কথা। এই যে এক মাত্রা কম নেওয়া (তিন মাত্রা), এই স্বাধীনতাটুকু স্বরবৃত্ত ছন্দে আছে, কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে তা নেই। ‘মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এক মাত্রা কম বা বেশি করার কোনো সুযোগ নেই, একেবারেই মাপা বাঁধা’।
এবার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক :
চার মাত্রার পর্ব :
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
এটাকে পর্ব ভাগ করলে কীরকম দাঁড়ায় তা দেখা যাক।
মনে রাখতে হবে যে, পর্ব ভাগ করতে পারাটাই আসল কথা। আগেই বর্ণনা করা হয়েছে যে, উচ্চারণে যখন পূর্ণ বিরতি পড়ে তখন সৃষ্টি হয় পূর্ণ যতি। পূর্ণ যতি দ্বারা বিভক্ত অংশকে বলা হয় পঙ্ক্তি, পূর্ণ যতির মধ্যবর্তী উচ্চারণ বিরতিকে বলা হয় অর্ধ যতি, আর, যতি যেখানে খুব ছোটো, ক্ষীণ বা লঘু, তখন তাকে বলা হয় লঘু যতি। সেই লঘু যতি দ্বারা খণ্ডিত বিভাগকে বলা হয় পর্ব।
আমাদের ছোটো নদী/চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার/হাঁটু জল থাকে।
এই কবিতায় ‘বাঁকে’ পর্যন্ত একটা পঙ্ক্তি (এখানে উচ্চারণে সম্পূর্ণ বিরতি পড়েছে অর্থাৎ পূর্ণ যতি)। ‘আমাদের ছোটো নদী’-এখানে এসে পড়েছে অর্ধ যতি এবং ‘আমাদের’ উচ্চারণের পর একটা ছোটো বা ক্ষীণ বিরতি পড়ে, সেটাকে বলি লঘু যতি এবং এটাই হচ্ছে একটা পর্ব।
তাহলে এই কবিতায় পর্ব গুলো হচ্ছে :
আমাদের/ছোট নদী/চলে বাঁকে/বাঁকে।
বৈশাখ/মাসে তার/হাঁটু জল/থাকে।
শেষে ‘বাঁকে ও থাকে’-এ দুটি ভাঙাপর্ব, অন্যগুলো পূর্ণপর্ব। প্রথম পর্বে মাত্রার সংখ্যা হচ্ছে চার। কেননা ‘আমাদের’ পর্বটাকে সিলেবল ভাগ করলে দাঁড়ায় ঃ আ + মা + র্দে। আ = মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা, মা = মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা, র্দে = বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা।
তাহলে ‘আমাদের’ ৪ মাত্রা।
এবার দেখতে হবে, প্রতিটি পূর্ণ পর্বে ৪ মাত্রা আছে কি-না!
ছোটনদী = ছো + ট + ন + দী = ৪ মাত্রা (চারটাই মুক্তাক্ষর),
চলে বাঁকে = চ + লে + বাঁ + কে = ৪ মাত্রা,
 ‘বৈশাখ’কে সিলেবল ভাগ করলে দাঁড়ায় : বই + শাখ। বই = বদ্ধাক্ষর=২ মাত্রা (মাত্রাবৃত্তে বই, হই, চই, কই, ছই, নাই, খাই, পাই, যাই, তাই ইত্যাদি বদ্ধাক্ষর হিসেবে গণনা করা হয়)। শাখ্ = বদ্ধাক্ষর = ২ মাত্রা, তাহলে বৈশাখ = ৪ মাত্রা।
মাসে তার = মা+ সে+ তার
মুক্তাক্ষরমুক্তাক্ষরবদ্ধাক্ষর
=১+১+২ = ৪ মাত্রা
হাঁটু জল = হাঁ + টু+ জল্
মুক্তাক্ষরমুক্তাক্ষরবদ্ধাক্ষর
=১+১+২ = ৪ মাত্রা
পঙ্ক্তির শেষে ‘বাঁকে’ ও ‘থাকে’ দুটো ভাঙাপর্ব প্রতিটিতে ২ মাত্রা করে বিদ্যমান।
তাহলে, এই কবিতায় মাত্রা বিন্যাস দাঁড়ায় এরকম :
৪ + ৪ + ৪ + ২
৪ + ৪ + ৪ + ২
তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে
মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়
একেবারে  উড়ে যায়
কোথা পাবে পাখা সে?
এটাকে পর্ব ভাগ করলে দাঁড়ায়ঃ
তালগাছ/এক পায়ে/দাঁড়িয়ে
সবগাছ/ছাড়িয়ে
উঁকি মারে/আকাশে
মনে সাধ/কালো মেঘ/ফুঁড়ে যায়
একেবারে/উড়ে যায়
কোথা পাবে/পাখা সে?
এটার মাত্রা বিন্যাস এরকম :
৪ + ৪ + ৩
৪ + ৩
৪ + ৩
৪ + ৪ + ৪
৪ + ৪
৪ + ৩
অর্থাৎ প্রতিটি পূর্ণপর্ব চার মাত্রায় এবং ভাঙাপর্ব তিন মাত্রায় গঠিত হয়েছে।
ভাঙাপর্ব প্রথম পঙ্ক্তিতে যদি দুই মাত্রা থাকে, তাহলে দ্বিতীয় পঙক্তিতে দুই মাত্রা থাকতে হবে। অন্যদিকে তৃতীয় পঙ্ক্তিতে গিয়ে ভাঙাপর্ব তিন মাত্রাও রাখা যাবে, কিন্তু তার পরের পঙ্ক্তিতে ভাঙা পর্বও তিন মাত্রার হতে হবে। প্রতি জোড়া লাইনের জন্য ভাঙা পর্বের মাত্রা একই রাখতে হবে।
চার মাত্রার পর্বের আরো উদাহরণ :
আবদুল হাই
করে খাই খাই
এক্ষুণি খেয়ে বলে
কিছু খাই নাই।
(লুৎফর রহমান রিটন)
ট্রেন যায় হিশ হিশ
বায়ু যায় ফিস ফিস
চোর যায় চুপচাপ
ট্রাক যায় ধুপ ধাপ
গরিবের দিন যায় কী করে?
কী করে?
কী করে?
জানবারসাধ হলে হাত দাও শিকড়ে
শিকড়ে
শিকড়ে।
(আসাদ চৌধুরী)
স্বপ্নরা স্বপ্নেই রয়ে যায়
দুঃখের রাতও ঠিক বয়ে যায়
আলোকের পথ চেয়ে তিলে তিলে
আয়ুটাও ক্ষয়ে যায়
স্বপ্নরা স্বপ্নেই রয়ে যায়
(রহমান হাবীব)
এখানে নিচের কবিতার ‘রাতও ঠিক’ পর্বে যদি মাত্রা গণনা করি, তাহলে দেখা যায়, রাত্=দুইমাত্রা, ও=১ মাত্রা, ঠিক=২ মাত্রা সর্বমোট ৫ মাত্রা হয়ে যায়।
কিন্তু ‘রাত ও ঠিক’ পর্বটি উচ্চারিত হয় এভাবে : ‘রাতো ঠিক’। তখন রা + তা + ঠিক =১+১+২=৪ মাত্রা হয়। আসলে ছন্দ বা মাত্রা গণনা হয় সিলেবলের উপর তথা উচ্চারণের উপর। কোন্ শব্দ কিভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, সেটার দিকেই লক্ষ্য রাখতে হয়।
পাঁচ মাত্রার পর্ব :
ঝর্ণা বেয়ে চাকমা মেয়ে নামে
ফুল তোলে সে ফুলের মেয়ে হতে
কখনও ঠিক সাজিয়ে ডানে বামে
বিক্রি করে রুপোলি সৈ কতে
ঝর্ণা বেয়ে = ঝর + না + বে + য়ে
বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর
= ২ + ১ + ১ + ১ =৫ মাত্রা
চাকমা মেয়ে = চাক্ + মা + মে + য়ে
বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর
= ২ + ১ + ১ + ১ =৫ মাত্রা
তদ্রুপ
ফুল তোলে সে = ফুল্ + তো + লে + সে
= ২ + ১ + ১ + ১ = ৫ মাত্রা
ফুলের মেয়ে = ফু + র্লে + মে + য়ে
= ১ + ২ + ১ + ১ = ৫ মাত্রা
কখনও ঠিক = ক + খ + নো + ঠিক
= ১ + ১ + ১ + ২ = ৫ মাত্রা
 সাজিয়ে ডানে = সা + জি + য়ে + ডা + নে
= ১ + ১ + ১ + ১+১=৫ মাত্রা
বিক্রি করে = বিক্ + রি + ক + রে
= ২ + ১ + ১ + ১ = ৫ মাত্রা
রুপোলি সৈ = রু + পো + লি + সই
= ১ + ১ + ১ + ২ =৫ মাত্রা
নামে/হতে/বামে/কতে ভাঙাপর্ব যার প্রতিটিতে আছে ২ মাত্রা। তাহলে মাত্রা বিন্যাস এরকম :
৫+৫+২
৫+৫+২
৫+৫+২
৫+৫+২
আরো উদাহরণ :
আধেক লীন/হৃদয়ে দূর/গামী
ব্যথার মাঝে/ঘুমিয়ে পড়ি/আমি
সহসা শুনি/রাতের কড়া/নাড়া
অবনী বাড়ি/আছ?
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
মনে কি পড়ে/নিঝুম কুয়ো/তলা
গাছ গাছালি/রাস্তা জম/কালো
মস্ত মাঠ/দেয়াল, ঘর/বাড়ি,
বকুল তলা/স্লোগান চম/কালো
(শামসুর রাহমান)
ঝরুক পাতা/পুরনো পাতা/হলুদ পাতা/ঝরুক
বীজের সুখে/সবুজ কুঁড়ি/অবুঝ পাতা/পড়ুক
শুকনো সেই/নদীতে আজ/নতুন বান/আসুক
আটকে রাখা/নৌকাগুলো/স্রোতের টানে/ভাসুক
(আল মাহমুদ)
বৃষ্টি পড়ে/বৃষ্টি পড়ে/অঝোরে ঝুপ/ঝুপ
কোথাও কারও/নেইতো সাড়া/সব কেমন/চুপ
(সুজন বড়ুয়া)
ছয় মাত্রার পর্ব :
সেই পল্টনে বলেছিলে তুমি
তোদের অস্ত্র জমা চাই,
পঁচাত্তরেই হেরে গেছি তাই
হে জাতির পিতা ক্ষমা চাই
(বিপুল বড়ুয়া)
সেই পল্টনে=সেই + পল্ + ট + নে
বদ্ধাক্ষর + বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর
= ২ + ২ + ১ + ১ = ৬ মাত্রা
বলেছিলে তুমি = ব + লে + ছি + লে + তু + মি =৬ মাত্রা
(সব কটি মুক্তাক্ষর)
তোদের অস্ত্র = তো + র্দে + অস্ + ত্র
মুক্তাক্ষর + বদ্ধাক্ষর + বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর
= ১ + ২ + ২ + ১ = ৬ মাত্রা
পঁচাত্তরেই = পঁ + চাত্ + ত + রেই
মুক্তাক্ষর + বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর + বদ্ধাক্ষর
= ১ + ২ + ১ + ২ = ৬ মাত্রা
হেরে গেছি তাই = হে + রে + গে + ছি + তাই
মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + বদ্ধাক্ষর
= ১ + ১ + ১ + ১ + ২=৬ মাত্রা
হে জাতির পিতা = হে + জা + র্তি + পি + তা
মুক্তাক্ষর + মুক্তাক্ষর + বদ্ধাক্ষর + মুক্তাক্ষর
= ১ + ১ + ২ + ১ + ১ = ৬ মাত্রা
‘জমা চাই’ এবং ‘ক্ষমা চাই’ ভাঙাপর্ব সেখানে প্রত্যেকটিতে মাতা সংখ্যা চার।
ছয় মাত্রার আরো উদাহরণ :
পাড়ি দিতে নদী/হাল ভাঙে যদি/ছিন্ন পালের/কাছি
মৃত্যুর মুখে/দাঁড়ায়ে জানিব/তুমি আছ আমি/আছি।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
স্বাধীনতা তুমি/রবি ঠাকুরের/অজয় কবিতা/অবিনাশী গান/
স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল/ ঝাকড়া চুলের/ বাবরি দোলানো/
মহান পুরুষ/ সৃষ্টি সুখের/ উল্লাসে কাঁপা।
(শামসুর রাহমান)
হুজুরের কাছে/মজুরের কোনো/দাম নেই
ভালো ও মন্দ/সকলি সমান/নাম নেই
এসব নিয়েই/ছড়া হতে পারে/
লাখো পাঠকের/পড়া হতে পারে/
কিন্তু হুজুর/নাখোশ হবেন/
তাই ছড়া লিখে/কাম নেই/
আমার হুজুর/চামারের মতো/
বলব না কারও/সামনেই।
(শিমুল মাহমুদ)
কালো এক ষাঁড়/
বাঁকা করে ঘাঁড়/
তেড়ে আসে তার/
শিং দুটো নিয়ে/
সাম্প্রদায়িক/
হিংসায়/
 যেন সেই ষাঁড়ে/
এগুতে না পারে/
বাধা দিতে তারে/
আমাদেরও ঠিক/
বড়ো বড়ো দুটো/
শিং চাই।
(ওমর কায়সার)
সাত মাত্রার পর্ব :
শোনো গো শোনো মেঘ/এসো না কাছে এসো/আরো
হঠাৎ কোথা থেকে
ওঠে কে যেন ডেকে
সামনে আশে পাশে/কোথাও দেখা নেই/কারও,
অনেক নিচে এক/রুমাল ওড়ে নীল/গাঢ়।
(সুজন বড়ুয়া)
এখানে মাত্রা বিন্যাস এরকমঃ
৭ + ৭ + ২
৭ + ৭ + ২
৭ + ৭ + ২
আরো কয়েকটি উদাহরণ :
আমরা পাখি হব/উড়তে নীলাকাশে
যেভাবে বলাকারা/মেঘের দেশে ভাসে
যেখানে ছোটো ছোটো/মেঘের আনাগোনা
তাদের ফাঁকে ফাঁকে/গলছে রোগ সোনা
আমরা যাব সেই/স্বপ্ন সুখী দেশে,
মুক্ত ডানা মেলে/হাওয়ায় ভেসে ভেসে
(রহীম শাহ্)
রোদের কণা থেকে/আবির মেখে মেখে
নিবিড় শ্যামলিমা/শিশির দেখে দেখে
ভোরের গান শুনে/আবেগে উচ্ছ্বাসে
নীলিমা ছুঁয়ে ছুঁয়ে/মেঘেরা নেমে আসে।
(অরুণ শীল)
যখন বড়ো হব/অনেক বড়ো আমি
বানানো ছোটো এক/যন্ত্র নামিদামি
সোনালি সবুজাভ
পৃথিবী করে যাবো
যুদ্ধ ঢেকে দেবো/শান্তিকামী আমি
হব না নিউটন/বা কারও অনুগামী
আমি তো হব ঠিক/আমার মতো আমি।
(রাশেদ রউফ)
আট মাত্রার পর্ব :
যখন শিশির ঝরে/জোছনালোকে
যখন ঘুমের ছানি/সবার চোখে
চুপি চুপি তুমি ঠিক/তখন এসে
দাঁড়াও ঘরের পাশে/জানালা ঘেঁষে।
এখানে মাত্রা বিন্যাস :
৮+৫
৮+৫
৮+৫
৮+৫
আরো কয়েকটি ঃ
বরকত জব্বার/রফিক-সালাম,
আমাদের ভালোবাসা/চেতনার নাম
বুকের রক্তে তারা/জ্বালিয়ে প্রদীপ
মায়ের কপালে এঁকে/দিয়ে গেল টিপ।
(ফারুক নওয়াজ)
মাগো তুমি বলো শুধু/খোকন পড়ো
হতে হবে জ্ঞানী গুণী/অনেক বড়ো
হতে হবে উঁচু শির/পাহাড়ের মতো থির
হতে হবে সুগভীর/সাগর খর
আকাশের মতো খোলা/বিশাল বড়ো।
(সুজন বড়ুয়া)
সবাই ঘুমিয়ে গেলে/রাত দুপুরে
চুপিসারে চলে এসে/খোলো জানালা
নিথিথের নিরালায়/নীর মুকুরে
দেখো দেখো ভেসে যায়/সোনার থালা
(আল মাহমুদ)
আমি যদি দৌড় ঝাঁপ/ভুলে থাকি চুপচাপ/খুব
নিজ মনে দেই একা/ডুব
ভুলে যাই গান গাওয়া/হয় না কোথাও যাওয়া/
ভুলে যাই পশ্চিম/পুব।
(সুজন বড়ুয়া)
এখানে আকাশ নীল/কচি রোদ ঝিল মিল
এখানে ফুলের মৌ/ভেসে ভেসে যায়,
এখানে সাগর নদী/ছুটে চলে নিরবধি
ঘাসের উপরে হাওয়া/হেসে হেসে যায়।
(রাশেদ রউফ)
পরিশেষে একটা কথা বলা যায় মাত্রাবৃত্ত ছন্দে যতটা বর্ণ, ততোটা মাত্রা। অর্থাৎ ‘আমাদের’ শব্দে চরটি বর্ণ, তাই সেখানে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ৪ মাত্রা।
আমাদের / ছোটো নদী / চলে বাঁকে / বাঁকে।
বৈশাখ / মাসে তার / হাঁটু জল / থাকে।
এখানে প্রতিটি পর্বে চারটি করে বর্ণ আছে, তাই প্রতি পর্বে চারমাত্রা বিদ্যমান। যেমন ঃ ‘বৈশাখ’-এর উচ্চারণ ঠিক এভাবে : বইশাখ, এখানে ৪টি বর্ণ।
অর্থাৎ মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষর দুই মাত্রা হিসেবে না ধরেও যতোটা বর্ণ ততোটা মাত্রা এই হিসেবেও গণনা করা যায়।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কিছু কবিতা
৪ মাত্রা পর্বের কবিতা :
অসময়ে মেহমান / সুকুমার বড়ুয়া
অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে
রেশনের পচা চাল
টল টলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন
ঠিক আছে ঠিক আছে
তিনি হেসে বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতা খান
ছাতাটা একটু হবে ?
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতা খান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন
ঠিক আছে ঠিক আছে।
হাত দাও শিকড়ে / আসাদ চৌধুরী
ট্রেন যায় হিশ হিশ
বায়ু যায় ফিশ ফিশ
চোর যায় চুপ চাপ
ট্রাক যায় ধুপ ধাপ
গরিবের দিন যায়
কী করে
কী করে
কী করে,
জানবার সাধ হলে হাত দাও
শিকড়ে
শিকড়ে
শিকড়ে।
সবকিছু আমাদের / রহীম শাহ
এই দেশ এই মাটি
সবুজের পরিপাটি
এই ফুল এই পাখি
রোদ্দুরে মাখামাখি
বাওড়ের নীল জল
কাক-চোখ টলমল
সবকিছু আমাদের।
এ আকাশ নীল নীল
এ বাতাস পিল পিল
ঝলমল তারাগুলো
মেঘেদের শাদা তুলো
জোসনায় ধোয়া হাত
জোনাকির উৎপাত
সব কিছু আমাদের।
ফাগুনের এই লাল
পলাশের হালচাল
দোয়েলের এই গান
তটিনীর কলতান
নীলঝুরি ভালোবাসা
কিছু সুখ কিছু আশা
সব কিছু আমাদের।
৫ মাত্রা পর্বের কবিতা :
অবনী বাড়ি আছে? / শক্তি চট্টোপাধ্যায়
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনে রাতের কড়া নাড়া
‘অবনী বাড়ি আছ?
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরান্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে
‘অবনী বাড়ি আছ?
আধেক লীন, হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়া নাড়া
অবনী বাড়ি আছ?
হিমছড়ি / রাশেদ রউফ
এখানে নীল আকাশ আছে নুয়ে
পাহাড় হাঁটে সাগর পারে পারে,
সূর্য ডোবে ঢেউয়ের মাথা ছুঁয়ে
জোছনা ঝরে নিবিড় সমাহারে।
পাহাড় ঘিরে জমাট সারি সারি
দাঁড়িয়ে আছে উতলা ঝাউবন,
পাশে অথই সাগর-বালিয়াড়ি-
আমায় টানে, নেয় কেড়ে এ মন।
ঝর্না বেয়ে চাকমা মেয়ে নামে
ফুল তোলে সে ফুলের মেয়ে হতে,
কখনও ঠিক সাজিয়ে ডানে-বামে
বিক্রি করে রুপোলি সৈকতে।
বৃষ্টি নামে যখনই র্ঝু র্ঝু
ঝাউয়ের শাখা শূন্যে মেলে পাখা,
হাওয়ায় ভাসে বিরাগী এক সুর,
সুরের টানে যায় না দূরে থাকা।
সাগরে ঢেউ ঘুঙুর পরে নাচে
বাতাসও খায় মিষ্টি গড়াগড়ি,
আমার কাছে স্বপ্ন হয়ে আছে-
স্বপ্নপুরী মায়াবী হিমছড়ি।
৬ মাত্রা পর্বের কবিতা :
প্রশ্ন/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে–
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো–
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে॥
আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপটরাত্রি-ছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি-প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।
কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,
অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে।
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে-
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?
স্বাধীনতা তুমি / শামসুর রাহমান
স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহিদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।
৭ মাত্রা পর্বের কবিতা :
যখন বড়ো হব /  রাশেদ রউফ
যখন বড়ো হব অনেক বড়ো আমি
পাবে না কেউ তবে
থাকব অনুভবে
ছাড়ব বাড়ি ঘর, মা-বাবা, মামা-মামি
কিন্তু ঠিক কারও হব না অনুগামী
শুধুই হেঁটে যাব আমার মতো আমি।
বানাব ছোটো এক যন্ত্র পৃথিবীতে
হবে সে আধুনিক
থাকবে ঠিক ঠিক
নীরবে উপকারে সবার হয়ে মিতে,
রাখবে আমাদের মুক্ত মিতালীতে
শান্তি নামাবে সে বৈরী  পৃথিবীতে।
যন্ত্র টিপে দিলে দেখব ধীরে ধীরে
রৌদ্র খেলা করে
হাওয়ায় চড়ে চড়ে
কখনও মানুষের সোনালি মন ঘিরে;
নেই যে হইচই কোথাও কোনো ভিড়ে,
বাতাস বয়ে যায় মিষ্টি ঝিরঝিরে
পৃথিবী হতে থাকে শান্ত ধীরে ধীরে।
রক্ত ঝরে না তো মিছিলে কোনো দেশে
ছোঁড়ে না কেউ বোমা কোথাও যম-বেশে
কোথাও রোগ নেই
মৃত্যু শোক নেই
সকলে আছে মিলে জড়িয়ে ভালোবেসে
থাকে না যুদ্ধের শঙ্কা অবশেষে।
যখন বড়ো হব অনেক বড়ো আমি
বানাব ছোটো এক যন্ত্র-‘নামিদামী’
সোনালি সবুজাভ
পৃথিবী করে যাবো
যুদ্ধ ঢেকে দেবো শান্তিকামী আমি
হব না পৃথিবীর কারও যে অনুগামী,
আমি তো হব ঠিক আমার মতো আমি।
৮ মাত্রা পর্বের কবিতা :
সোনার তরী / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা  ধান-কাটা হলো সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা–
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥
একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা–
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা  তরুছায়ামসী-মাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা  প্রভাতবেলা।
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে।
ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে-
দেখে যেনমনে হয় চিনি উহারে।
গুগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে?
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।
যত চাও তত লও তরণী-’পরে।
আর আছে?-আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলই দিলাম তুলে থরে বিথরে–
এখন আমারে লহো করুণা করে।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে রহিনু পড়ি-
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ : বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ
স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের মতো ‘অক্ষরবৃত্ত’ ছন্দকেও বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। এ ছন্দকে রবীন্দ্রনাথ বলতেন ‘সাধুছন্দ’, সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন ‘আদ্যা’, মোহিতলাল বলতেন ‘পদভূমক’। প্রবোধচন্দ্র সেনের দেয়া ‘অক্ষরবৃত্ত’ নামটিই আমরা বেছে নিলাম। এ ছন্দকে বাঙালির স্বাভাবিক ছন্দ হিশেবে ধরে নিয়েছেন ছন্দ বিশারদগণ। আমরা যে কথা বলি, এ কথা বলার ছন্দটাকে অনেকটা অক্ষরবৃত্তে ফেলা যায়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বাংলা কাব্যের প্রধান ছন্দ। অন্য দুটির তুলনায় এ ছন্দের উচ্চারণ অধিকতর স্বাভাবিক এবং গদ্য উচ্চারণভঙ্গির অনুসারী বলেই এটি বাংলা কাব্যের প্রধান ছন্দে পরিণত হয়েছে। অক্ষরবৃত্ত শ্বাসাঘাতপ্রধান নয়, তানপ্রধান ছন্দ। তান হচ্ছে স্বরধ্বনি বা সাধারণ উচ্চারণের অতিরিক্ত টান, যা এ ছন্দে পর্বগত দীর্ঘতার জন্য প্রযুক্ত হয়।
‘অক্ষরবৃত্ত’ ছন্দের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর গতি বা লয় দ্রুত নয়, আবার অতি ধীরও নয়। এই ছন্দে মুক্তাক্ষর এক মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে থাকলে দুই মাত্রা এবং শব্দের শুরুতে বা মাঝখানে থাকলে এক মাত্রা হিশেবে গণনা করা হয়। তবে কিছু কিছু শব্দে যেমন কথা ক্রিয়াপদে, প্রত্যয়ান্ত, সমাসবদ্ধ শব্দে মাত্রা গণনায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়। একজন, দিনরাত, কাকটা, গোলমাল ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রে কানের খুশির দিকে লক্ষ্য রেখে মাত্রা গণনা করতে হবে।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ৮+৬, মাত্রার চালে চলে। এই ছন্দে সাধারণত পূর্ণ পর্ব আট বা দশ মাত্রায় হয়। সব সময় জোড় মাত্রার চালেই এগিয়ে যায়। যদি কখনও বিজোড় মাত্রার পর্ব দেখা যায়, তখন কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে, ওই পর্বটিতে জোড় মাত্রার সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে।
এ ছাড়া মধ্যযুগে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে সুর একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে,  পনেরো শতকে বাংলা সাহিত্যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রামায়ণ ও  মহাভারত অনুবাদের কারণেই এতে সুর সংযোজিত হয়। অবশ্য উনিশ শতকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে এ ছন্দের সুরমুক্তি ঘটে। ফলে এ শতক থেকে রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি কাব্যের ‘গান’ ব্যতিরেকে শুধু ‘পাঠ’ প্রচলিত হলেও পর্বগত দীর্ঘতার কারণে তান আজও বজায় আছে।
এবার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক:
বহু দেশ দেখিয়াছি/বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা/মিটে কার জলে? (৮+৬)
বহু = ২ মাত্রা (ব+হু)
দেশ = ২ মাত্রা
দেখিয়াছি = ৪ মাত্রা (দে+খি+য়া+ছি)
মোট = ৮ মাত্রা,
বহু = ২ মাত্রা নদ = ২ মাত্রা
দলে = ২ মাত্রা মোট = ৬ মাত্রা
কিন্তু = কিন্+তু=২ মাত্রা, এ=১ মাত্রা
স্নেহের = স্নে + হের = ৩ মাত্রা (শব্দের শেষে বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা)
তৃষ্ণা = তৃষ্ + না = ২ মাত্রা মোট = ৮ মাত্রা
মিঠে = ২ মাত্রা কার = ২ মাত্রা
জলে = ২ মাত্রা মোট = ৬ মাত্রা
এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে/হে মঙ্গলময়,
দূর করে দাও তুমি/সর্ব তুচ্ছ ভয়।
(রবীন্দ্রনাথ)
মহাভারতের কথা/অমৃত সমান ॥
কাশীরাম দাস কহে/শুনে পুণ্যবান ॥
——- —— —-
আবার জাগিনু আমি/রাত্রি হলো ক্ষয়,
পাপড়ি মেলিল বিশ্ব/এই তো বিস্ময়।
এবার ৮ + ১০ পর্বের কয়েকটি উদাহরণ দিই :
বাইরে কি বৃষ্টি নামল? / আহা ঠিক বিকেল এখন
বাবুরা বেজায় ভিজছে? / ভিজছে নাকি পথচারিনীরা?
(আকাশে মানুষে বুঝি/কৌতুকের এই শুভক্ষণ)
আমি কি শুয়েই থাকব/শুনব না কি বৃষ্টির মন্দির?
ধ্বনি খুঁজে প্রতিধ্বনি/প্রাণ খুঁজে মনে প্রতি প্রাণ
জগৎ আপনা দিয়ে/খুঁজিছে তাহার প্রতিদান।
চামেলি পোশাক পরলো/চলো যাই ঢের রাত্রি হোলো,
নীলকণ্ঠ, শুনতে পাচ্ছ/এবার তোমার সাজ খোলো।
অক্ষরবৃত্তের ৮ + ৬ মাত্রার চালকে পয়ার বলে। পয়ারের প্রত্যেক চরণ দুই পর্বের। চরণের মাত্রা সংখ্যা ৮ + ৬ =১৪। চরণের শেষে অন্ত্যমিল থাকে, দুই চরণেই গঠিত হয় স্তবক। আগেই বলা হয়েছে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই ছন্দে এনেছেন নতুন প্রাণ।
তিনি ৮ + ৬ =১৪ মাত্রার চালকে ঠিক রেখে করেছেন যতিলঙ্ঘন। পঙ্ক্তির শেষে যতি না পড়ে, স্বাধীনভাবে পড়ছে। এটাকে বলা হয় ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দ। যেমন:
সম্মুখ সমরে পড়ি/বীর চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যাবে/গেলা যমপুরে
অকালে, কহ হে দেবী/অমৃত ভাষিণী
কোন বীরবরে বরি,/সেনাপতি পদে
পাঠাইলা রণে পুন:/রক্ষকুল নিধি
রাঘবারি?
এখানে যতি পঙ্ক্তির শেষে না পড়ে বীরবাহু, অকালে বা রাঘবারি’র শেষে পড়েছে। কিন্তু ছন্দ ৮+৬ মাত্রার চালেই এগিয়েছে।
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখের দাবি রাখে যে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে পূর্ণ পর্ব সাধারণত আট বা দশ মাত্রায় সম্পন্ন হয় বলে ইতোপূর্বে আলোচিত হলেও এ নিয়মকেও আধুনিক কবিরা ভেঙে দিয়েছেন। তাঁরা ৮ + ৬, ৮ + ১০, ১০ + ৬ ইত্যাদি পর্বে এগিয়ে নিয়েছেন তাঁদের কবিতা। যেমন :
এখন যৌবন যার/মিছিলে যাবার তার/শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার/যুদ্ধে যাবার তার/শ্রেষ্ঠ সময়
( ৮ + ৮ + ৬)
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে একটা সুবিধা হলো, এর পর্বে কখনও ১ মাত্রা কম হলে অথবা ১ মাত্রা বেশি হলেও তার সুর বা তাল ঠিক রেখে পড়া যায়, যা অন্য ছন্দের বেলায় কল্পনাতীত। যেমন:
মিছিলের সব হাত/কণ্ঠ পা এক নয়
এখানে সংসারী থাকে/সংসার বিরাগী থাকে
কেউ আসে রাজপথে/সাজাতে সংসার
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা/জালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা/তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয়/অস্তিত্ত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে
কোনো কোনো প্রেম আছে/প্রেমিককে খুনী হতে হয়, যদি কেউ ভালোবেসে/খুনী হতে চান/তাই হয়ে যান উৎকৃষ্ট সময়/আজ বয়ে যায়।
(হেলাল হাফিজ)
আরো কয়েকটি উদাহরণ :
মাছ কি জলের স্পর্শ বোঝে?/(১০)
আমার ছিল না তৃষ্ণা/তোমার প্রবাহ ছিল/আমার ভেতর
(৮ + ৮ + ৬)
আমার ছিল না প্রেম/তুমি ছিলে ইন্দ্রিয়ের/পাঁচটি শাখায়
(৮ + ৮ + ৬)
আমার ছিল না প্রশ্ন/জবাবদিহির মতো/অবস্থান তোমার নিজের
(৮ + ৮ + ১০)
ক্ষুধার্ত হওয়ার আগে/আমার ছিল না কোনো ক্ষুধা।
(৮ + ১০)
(বিশ্বজিৎ চৌধুরী)
মধ্যাহ্ন ছুঁয়েছে বয়স/
তুমি আজো বাইশ ছুঁই ছুঁই/
খরতাপ পুড়েছে হৃদয়/
তুমি তার বোঝনি কিছুই।/
(আকতার হোসাইন)
ঠিক এরকম এগিয়েছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের টান বা তান। এই ছন্দ অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। তাই এর মাধ্যমে কবিরা দেখাতে পারেন বিভিন্ন কলাকৌশল।
এবার একটি কবিতার উদাহরণ টানতে চাই। কবিতাটির শিরোনাম ‘বাল্মীকি, কালিদাস ও ভুসুকু’। কবি ময়ুখ চৌধুরী।
১.
দ্বিতীয় বাল্মীকি নেই,
তাই
পাখিরা মিথুনলগ্নে মানুষের সামনে আসে না।
২.
আজ-কে করেছ জয়,
কাল-কে করেছ জয়,
তুমি দাস নও, তুমিই কালের প্রভু;
মেঘের ভাষায় রামগিরি কাঁদে তবু।
তোমার কালিতে কালের অনেক ঋণ,
কোন বনে আজ ঘুরিয়া বেড়ায় শকুন্তলার হরিণ।
তুমি ছিলে তুমি আছ,
সেই কথা জানে দুষ্মন্তের অঙ্গুরী-গেলা মাছও।
কিছু ভুল ছিল শুরুতে,
মেঘদূতময় সংসারে বেঁচে আছি;
পরমায়ু বাঁধা রয়েছে তোমার ভুরুতে।
৩.
হরিণকে-যে হরিণ বলি, হরিণ কি তা জানে?
কবি হরেন ভুসুকু পা তাহার পিছনটানে।
ভুসুকু তো কবি হলেন তরঙ্গিত পায়ে।
পদ্মা নদী ভেসে গেলো পর্যাপদের নায়ে।
ও ভুসুকু ও ভুসুক ও ভুসুক পা
কাব্যকলার মন্ত্র আমায় শিখিয়ে দিয়ে যা।
এই কবিতার তিনটি অংশ; এক একটি অংশে এক এক ছন্দের প্রয়োগ। প্রথমটি অক্ষরবৃত্ত, দ্বিতীয়টি মাত্রাবৃত্ত এবং তৃতীয়টি স্বরবৃত্ত ছন্দের। একই কবিতায় বিভিন্ন ছন্দ ব্যবহারের ধরণ ও সৌন্দর্য একমাত্র শক্তিমান কবিরাই দেখাতে পারেন।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা কিছু কবিতা :
বঙ্গমাতা/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
সে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি–তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু ক’রে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালো ছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ সয়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছে বাঙালি করে–মানুষ করনি।
বনলতা সেন/জীবনানন্দ দাশ
হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকার মালায় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভনগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুই দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
চুল আর কবে কার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা।
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে, অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
ছন্দহীন পৃথিবী অচল
ছন্দ একটি বিজ্ঞান। গণিতের সূত্রের মতো এতেও রয়েছে কতিপয় সূত্র। সূত্র ধরে এগুতে পারলে অঙ্কের সমাধান যেমন নিশ্চিত, তেমনি ছন্দের সূত্রমতো অগ্রসর হলে কবিতায়ও সৃষ্টি হবে একটি তাল, সৃষ্টি হবে একটি সুর। সুরটা ধরে রাখতে পারাটাই মুখ্য বিষয়।
ছন্দ কোথায় নেই?
ছন্দ ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। ছন্দহীন পৃথিবী অচল। মানুষ যে হাঁটছে, তাতে ছন্দ আছে; তার কথা বলার মধ্যে ছন্দ আছে। কাক যে কা কা করে ডাকছে, কোকিলের যে কুহু কুহু রব, শেয়ালের যে হুক্কাহুয়া ডাক, ঝিঁ ঝিঁ পোকার যে ঝিঁঝিঁ ঝিঁঝিঁ স্বর-সবখানে রয়েছে ছন্দ। তা হয়তো কোথাও সুনিয়ন্ত্রিত, আবার কোথাও অনিয়ন্ত্রিত। কোথাও সুনিয়মিত, আবার কোথাও অনির্দিষ্ট। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘কবিতার ছন্দ যে নিয়মে উৎপন্ন হয়েছে, বিশ্বজগতে সমস্ত সৌন্দর্যই সে নিয়মে সৃষ্টি হয়েছে। একটা সুনির্দিষ্ট বন্ধনের মধ্য দিয়ে বেগে প্রবাহিত হয়ে মনের মধ্যে আঘাত করে বলেই সৌন্দর্যের এমন অনিবার্য শক্তি।’
ছন্দ এক অনিবার্য মাধ্যম, যা থেকে কবিতাকে মোটেই আলাদা করা যায় না। আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, ‘চৈতন্যহীন শরীর বা শরীরহীন চৈতন্যের মতো ছন্দহীন কবিতা বা কবিতাহীন ছন্দ সোনার পাথরবাটি মাত্র। কবিতা থেকে ছন্দকে পৃথক করা যায় না, ছন্দ থেকে কবিতাকেও আলাদা করা অসম্ভব। সেদিক থেকে ছন্দ বিচার কবিতারই বিচার, কবিতার বিচারেও ছন্দের আলোচনা অবশ্যম্ভাবী।’
এখানে বলে রাখা দরকার যে, শুধু ছন্দের টুংটাং অনুরণনে যেমন কবিতা হয় না, তেমনি শুধু ভাব ও আবেগের প্রাণহীন প্রকাশও কবিতা নয়। ছন্দ, কথা, ভাব, আবেগ, চিত্রকল্প-সবকিছুর সমন্বয়েই সৃষ্টি হয় এক একটি কবিতা।
ছন্দের যে সব সূত্র ছান্দসিকরা আবিষ্কার করেছেন, সে-সব কেবল কবিতায় সুর তোলার জন্য। এনিয়ম অনুসরণ না করেও যদি কবিতায় সুর তোলা সম্ভব হয়, তাহলে সেটাও হয়ে ওঠে গ্রহণযোগ্য। উদাহরণ হিসেবে নজরুল ইসলামের ‘লিচুচোর’ কবিতাটিকে টানতে পারি। স্বরবৃত্ত চন্দের নিয়মটা হলো, ‘সাধারণত প্রতি পর্বে চারটি করে মাতা থাকবে।’ কিন্তু ‘লিচু চোর’-এ দেখা যায়, ৩+৪, ৩+৪ করে মাত্রা বিন্যাস।
বাবুদের/তালপুকুরে
হাবুদের/ডাল কুকুরে
সে কি বাস/করলে তাড়া
বলে থাম/একটু দাঁড়া…..।
স্বরবৃত্ত ছন্দের যে চিরন্তর সুর, ওটা এখানে অন্যভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এই নিয়মটি স্বরবৃত্ত ছন্দের জন্য ব্যতিক্রমী হিসেবে কাজ করছে। মোট কথা, কবি নজরুল তাঁর অসামান্য প্রতিভাগুণে স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রচলিত ধারাকে এড়িয়ে অন্যভাবে সুর সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
তাই ছন্দ অপরিবর্তনীয় হলেও ছন্দের প্রবাহ পরিবর্তনশীল। প্রচলিত ধারার উপর ছন্দ বিশারদ বা ছন্দ বিষয়ে অভিজ্ঞ কবিরা রীতিমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, ভাঙচুর করেন এবং তাতে কখনও কখনও তাঁরা হয়ে ওঠেন সফল।
আমি এ ছোট্ট পরিসরে বাংলা কবিতার প্রধান তিন ছন্দের সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি মাত্র। এ বিষয়ে প্রচুর সমৃদ্ধ বই রচিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠক তাঁর পছন্দমতো বই সংগ্রহ করতে পারেন। তবু এখানে তিনটি গ্রšে’র নাম উল্লেখ করছি, যেগুলো অপেক্ষাকৃত সহজপাঠ্য। ১. কবিতার ক্লাশ : নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ২. ছন্দ: আবদুল মান্নান সৈয়দ ৩. বাংলা ছন্দের রূপরেখা : মাহবুবুল আলম।

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...