ড. মাহবুব হাসান
অগ্নি-বীণা : বিশ্ব পুরাণের মিথষ্ক্রিয়া
কাজী নজরুল ইসলামের মিথ-প্রবণতার বিশ্ব-বৌদ্ধিক চেতনার কথা আমরা জানি। তিনি যে সমবায়ী মিথষ্ক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, তাও কম বেশি জ্ঞাত। কিন্তু কেন তিনি বিশ্ব পুরাণকে তাঁর নিজের সম্পদ বিবেচনা করেছেন, সে কথা হয়তো কেউ বলেননি। নজরুল তাঁর সাংস্কৃতিক জাগর-চৈতন্য থেকেই উপলদ্ধি করতে পেরেছেন যে, তিনি পৃথিবীর মানবযাত্রার সাংস্কৃতিক সম্পদের উত্তরাধিকারী। ভাব-সম্পদে তিনি মানবমুখীই কেবল নন, তিনি একদিকে জাতীয়তাবাদী ও জাতিসত্তার উদ্বোধক আর বিশ্ব মননমনীষারও কবি-চেতনা লালন করে বৈশ্বিক নাগরিকের উত্তরাধিকারী হয়ে উঠেছিলেন। বোধ করি এ-কারণে তিনি আস্তিক হয়েও আচার-সর্বস্বতায় ছিলেন অবিশ্বাসী। কোনো ধর্মেই নিজেকে তিনি সংস্থাপিত করেননি। নজরুলের মানস প্রবণতা সম্পর্কে তাই জানাটা অত্যন্ত জরুরি। এই জরুরি বিষয়ে ড. সৈয়দ আকরম হোসেন দুটি চমৎকার সার-কথা নির্মাণ করেছেন।
১. “কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিভা-শক্তির উৎসবিন্দু কিংবা সংবেদন বলয়ের পরিসীমা বিন্দুসংহত অভিজ্ঞতায় সংস্থিত নয়, মূলত: অভিজ্ঞতা বিশেষিত হৃদয়াবেগে শিল্পদিক্ষিত। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের ক্রম অপসৃয়মান, ভগ্নপক্ষ, নৈরাশ্যমগ্ন ও চূর্ণ-স্বপ্ন সমাজচেতনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে নবজাগ্রত বাঙালি মুসলমান-মধ্যবিত্তশ্রেণির চেতনাস্পৃর্শী নজরুল ছিলেন মূলত: তারুণ্যশাসিত, আবেগে সংরাগে উচ্চকিত, জীবনার্থে স্বপ্নময়, ভবিষ্যতে বিশ্বাসী, অস্তিত্ব বিস্তারে সীমাহীন, রোমান্টিক অনুভবে প্রেম-সৌন্দর্য-মুগ্ধ এবং অচরিতার্থতা ও ব্যর্থতায় ছিলেন প্রতিবাদী, বিদ্রোহী।৯
২… ‘নজরুল মানস-প্রবাহে বহুমুখী স্রোতের যোগাযোগ স্বতঃই স্বাভাবিক। বিদ্রোহ, প্রশান্তি, বাস্তববোধ, আধ্যাত্মিক রোমান্টিক প্রবণতা, স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা, নৈরাজ্যিক অস্থিরতা, সাম্যবাদী চিন্তা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস প্রভৃতির যোগফল নজরুল-চেতনাপ্রবাহ। এ-সব পরস্পর বিরোধী উপাদানসমূহ নজরুল ইসলাম গ্রহণ করেন, সুস্থির সচ্ছন্দে নয়; বরং গতিবান অস্থিরতায়, যন্ত্রণায়। পরস্পর প্রতিযোগী চেতনার সংঘাতে তিনি কোন অনিবার্য, ঐতিহাসিক সংশ্লেষে (ঝুহঃযবংরং) উপস্থিত নন, কোন দর্শনের বিশ্বাসী বলয়ে সুস্থির নন, বরং অতিদ্রুত রূপান্তরাশ্রয়ী। এ-রূপান্তর অকারণ নয়, বরং তা সম্ভব হয়েছে মানবপ্রেম, স্বাধীনতা আর কল্যাণ বাস্তবায়নের অসম্ভব তাগিদে, অকৃত্রিম আন্তর-গরজে। নজরুল ইসলাম তাঁর কালের রাষ্ট্রিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সংগ্রাম, সংঘর্ষ, বিদ্রোহ, প্রতিবাদকে ধারণ করেই হয়েছেন বর্ধিত, পরিণামমুখী। নজরুল যেন পুরাণের বিধ্বস্ত জটায়ূ অশুভ রাবনের মুখোমুখী অসমযুদ্ধে সংগ্রামরত;১০
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি দুটিতে নজরুল মানসপ্রবাহের নানামুখী স্রোতের প্রবণতাগুলো উল্লিখিত হয়েছে। পরস্পৃর বিপরীত মনন-শাসনের দ্বৈরথে নজরুলর মানব পরিভ্রমণ কোনো হঠাৎ বা আকস্মিক প্রবণতা নয়, আর অর্জিত অভিজ্ঞানের আলোকে সজ্ঞার রূপই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতায়। তাঁর নানামুখী চিন্তাধারা আর প্রবণতা সত্ত্বেও নজরুলর মধ্যে একটি কেন্দ্রিয়-শাসন কাঠামো ছিল তা তাঁর জীবন- পরিবেশ-প্রতিবেশ জাত ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা-কুশিক্ষা-সামাজিক-অনাচার-অন্যায় আর মানবতার নির্মম পরিণতিতে তিনি বিক্ষুব্ধ-প্রাণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সমাজ কাঠামোয় চেয়েছিলেন সাম্য, বৈষম্যহীনতা; সে-সমাজগত কিংবা ধর্মাচারগত উভয় দিক থেকেই তাঁর এই প্রত্যাশা জাগ্রত হয়ে উঠেছিল। উপনিবেশ-জর্জর ভারতীয় সমাজের রুদ্ধচেতন ও ভয়াক্রান্ত রাজনীতিকদের পদলেহনের বিপক্ষে প্রথম সৌর্যময় প্রতীকী বিদ্রোহে নজরুল রচনা করেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’, যা তাকে রাজনৈতিক বিদ্বেষে ও শাসক গোষ্ঠীর রোষের কারাগারে বন্দী করে।১১
অথচ তার আগেই প্রকাশিত হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায়। দু’টো কবিতার রচনাকাল সমসাময়িককালের। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ মুদ্রিত হয়েছিল তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায়। ‘তিনি তৎকালীন বিশ্বের যুগমানসকেই তাঁর কাব্যে, জীবনে, গানে, উপন্যাসে মূর্ত করে তুলেছিলেন; এবং বাঙালী সমাজের একটি বিশিষ্ট ও বিপুল অংশের সাংস্কৃতিক মাত্রাকে তিনি সুনির্দিষ্ট করে দিচ্ছিলেন।১২
বলা বাহুল্য ‘ক. অসত্য, অকল্যাণ, অমঙ্গল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: খ. স্বদেশের মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; এবং গ. কবির শৃংখল-পরা আমিত্ব-কে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিদ্রোহ’।১৩
অগ্নি-বীণা কাব্যের বিদ্রোহীরূপের ত্রিমাত্রা। আবার আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন যে, ‘অগ্নি-বীণা কাব্যের কেন্দ্রীয় ভাব বিদ্রোহ, আর এই বিদ্রোহের সপক্ষে শক্তিসঞ্চয়ের বাসনায় নজরুলের ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণ-স্মরণ।১৪
সমসাময়িক জীবন, সমাজ কাঠামো ও বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মানসলোক-ধৃত ভাব-অভীপ্লার রূপায়ণ সম্ভব ছিল না বলেই তিনি ভারতীয় পুরাণের আশ্রয় নিয়েছেন। ইসলামী ঐতিহ্যও ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় একই কারণে। সমকালীন সমাজের ক্লীব, নৈরাশ্যপীড়িত ও মেরুদণ্ডহীন মধ্যবিত্ত বাঙালির চরিত্রে নজরুল ইসলাম তার চৈতন্যে লালিত বিদ্রোহী ও বলবান ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাননি। …এই সাহস দৃপ্ত বেগবান সাহসী পুরুষের প্রতিমান কবি খুঁজে পেয়েছেন ভারতীয় পুরাণে। নটরাজ শিবের মধ্যেই তিনি ভারতীয় জড় সমাজে অনুপস্থিত সেই যৌবনদৃপ্ত বেগবান সাহসী পুরুষকে আবিষ্কার করেছেন।১৫
সাহসী, শক্তিমান পুরাণ প্রতীক কেবল ভারতীয় মিথ থেকেই তিনি সংগ্রহ করেননি ভিনদেশি ইতিহাসের বীরপুরুষ কিংবা নিষ্ঠুর শ্রেণির নৃশংসতার প্রতীক পুরুষদেরও গ্রহণ করেছেন সদার্থে। কেননা, সেই বীর সাহসী পুরাণ পুরুষ বা ইতিহাসের পুরুষদের তিনি বিদ্রোহী কবিতায় ‘আমি’র বিপরীতে ব্যবহার করেছেন। যেমন, ‘আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস/ আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।’
এ-কথাই প্রমাণ করে তিনি মুক্ত-প্রাণ বেদুইন-চরিত্র এবং দুর্র্ধর্ষ হিংস্র মোঙ্গল চেঙ্গিস খান-এর নৃশংসতা তার নজরুলর চরিত্রের সমান্তরালে এনে দাঁড় করিয়েছেন। কেননা, তিনি যাদের উদ্দেশ্যে এই বিদ্রোহী বাণী সৃজন করছেন তারা তার শত্রুপক্ষ – বাস্তবে ঔপনিবেশিক শক্তি ইংরেজের ভারতীয় সরকার। ত্রাস সৃষ্টির নিমিত্তেই যে চেঙ্গিস খানের ধ্বংসযজ্ঞের নারকীয় প্রতীক তিনি উপস্থাপন করছেন, তা পাঠকের চোখে সংগুপ্ত থাকে না। একদিকে তার মানস চৈতন্যের কেন্দ্রীয় প্রতিভূ শিব ও নটরাজ শিব-এর ধ্বংস আর সৃজন শিল্প বোধে উদ্ধুদ্ধ কবি-প্রাণ অন্যদিকে ইতিহাসের বেদুইন সদৃশ মুক্তপ্রাণ-স্বাধীনজীবন ও চেঙ্গিসী নরকযজ্ঞের প্রতিরূপক নিয়তই তার মননশৈলীর ক্রসকারেন্টকে বিচিত্র ভবনের অর্জনে পরিণত করেছে।
অগ্নি-বীণা কাব্যে (১৯২২) মিথ-পারম্পর্য আলোচনার আগে এ-কবিতা বিষয়ক কিছু তথ্য জানানো যাক। ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যে মোট ১২টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলোর শিরোনাম হচ্ছে; ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’, ‘আগমনী’, ‘ধূমকেতু’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’, ‘রণ-ভেরী’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’।
‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় নজরুল ইসলাম তাঁর মিথশক্তির পরমপুরুষ নৃত্য- পাগল, মহাকালের চণ্ডরূপ ধ্বংস আর সৃজন পুরুষ যিনি ভয়ংকর হাসি হাসতে হাসতে আসছে-সেই নটরাজ শিবকে নির্মাণ করছেন। অর্থাৎ আরাদ্ধ শক্তির প্রতীক নটরাজ শিবের আগমনকে জয়ধ্বনি দিয়ে বরণ করবার আহ্বানই উচ্চারিত হয়েছে এ-কবিতায়। ‘বিদ্রোহী’তে এসে নটরাজ শিব-এর পাশাপাশি তাঁর নানান রূপক নামও উপস্থিত আর সমস্ত মিথ বীরপুরষ, ঐতিহাসিক বীরপুরুষ, নৃশংসতার প্রতীকপুরুষ এক মহাবিদ্রোহের উপান্তে এসে উপস্থিত।
‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় চণ্ডীদেবীকে রণরঙ্গিনী বেশে প্রত্যাবর্তন করতে বলছেন। ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/ এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু’-এই সূচনায় ‘ধূমকেতু’র মতো মহাজাগতিক জ্যোতির্মগুলির উপকরণ নজরুল বিদ্রোহী চৈতন্যের শক্তির সহযোগ শক্তি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এরপরের কবিতা ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’, ‘রণ-ভেরী’ ‘শাত-ইল-আরব’ ইতিহাস-আশ্রিত এবং বীরত্ব সূচক কবিতা। ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’ ধর্মীয় ইতিহাস-মিথচেতন হলেও ত্যাগ আর বীরত্বব্যঞ্জক। অর্থাৎ কাজী নজরুল ইসলাম ভারতীয়-গ্রিক-ইসলামি মিথ ও ইতিহাস ঐতিহ্যের বীরবাহুদের প্রতীক রূপকের ছদ্মাবরণে পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তি সংগ্রামে ওই শক্তির প্রত্যাশা করেছেন। এ-মুক্তি পরাধীনতার গ্লানি আর শৃঙ্খলমুক্তিরই কেবল নয়, এ-মুক্তি ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, সামাজিক অন্যায় আর রাজনৈতিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথাকাব্যের বিদ্রোহ। মিথশক্তির মধ্যে এই যে সমান্তরাল মিথষ্ক্রিয়া করা- এটা তাঁর বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের চৈতন্য থেকে উৎসারিত হয়েছে।
‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যের ভূমিকা কবিতা হচ্ছে ‘প্রলয়োল্লাস’। প্রলয়-এর সঙ্গে উল্লাসের যে যোগ- এই সম্পূর্ণ বিপরীত বা বিরোধী দুটি শব্দকে একই সঙ্গে নব সৃষ্টির মন-মানসিকতা নজরুলের চেতনায়ই একমাত্র সম্ভব এবং তা প্রকাশ পেয়েছে নটরাজ-শিব-এর মিথ-ভাষ্যের ভেতর দিয়ে। এই যে জয়ধ্বনি করার ঘোষণা বা আহবান, তা কিন্তু নিজের আত্মপ্রকাশকেই উদ্বোধিত করছে। নটরাজ শিব এখানে নজরুল চেতনার প্রকাশ্য রূপক। তার সংগুপ্ত শক্তির প্রতীক হচ্ছে নটরাজের ধ্বংসকারী ও সৃষ্টিকারী মিথ-অর্থ। অর্থাৎ নজরুল নিজেকেই নটরাজ শিব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু পারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।
মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
মহাকালের চণ্ড-রূপেÑ
ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্করÑ
ওরে ওই হাসছে ভয়ঙ্কর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
এ-কবিতার কাল বিচার করলে নজরুলর আবির্ভাবকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। প্রলয়োল্লাসে নটরাজ শিবের আড়ালে নজরুলের সাহিত্যে প্রবেশকে যেমন প্রতীকিত করতে পারি, তেমনি ‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে’ সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্যময় বৈপ্লবিক উত্থানকে চিহ্নিত করতে পারি। কারণ ওই সিংহদ্বারে ধমক হেনে আগল ভেঙে মুক্ত-স্বাধীন হয়েছে রাশিয়ার জনগোষ্ঠী। এই কথাগুলোই কবি মানবেতর মানবগোষ্ঠী ভারতের নির্বীর্য পুরুষদের জানিয়েছেন। তাছাড়া মহাকাল-রূপ শিবের অন্যরূপও বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর-রূপে কিন্তু তার মুখে হাসি-‘ভয়ঙ্কর হাসছে’ এই ত্রাসিত রূপ কেন নজরুল নির্মাণ করেছেন, তা উপলব্ধি করতে হলে নটরাজ শিব মিথের অন্তর্গত শক্তি তার সৃজন-বেদনার মিথকল্প জানা জরুরি।
‘নটরাজ শিব ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় অনন্য দৃশ্যকল্প ও চিত্রকল্পে সমর্পিত। শিব এখানে একদিকে প্রলয় পাগল এবং অন্যদিকে নব-উন্মেষের প্রতীক। ভারতীয় পুরাণে ‘মহাকাল’ ও ‘রুদ্র’ শিবের নামান্তর। এই শিব সর্ব সংহারক। আবার এই দেবতাই নব সৃষ্টির প্রতীক শুধু নন, সৃষ্টির রক্ষকও। প্রলয়োল্লাস-এর নটরাজ শিব ধ্বংস ও প্রলয়ের নেশায় উন্মত্ত, নৃত্যনেশায় বেগবান। এই সর্বব্যাপী প্রলয়ের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার আবির্ভূত হবে নব-সৃষ্টি। এ-জন্যই নটরাজ শিব কাজী নজরুল ইসলামের থেকেই আবার আবির্ভূত হবে নব-সৃষ্টি। এ-জন্যই নটরাজ শিব কাজী নজরুল ইসলামের অন্তর্গত অভীপ্সার যথাযথ প্রতিরূপক (allegory) হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। …জীর্ণ-পুরাতন জীবনধারা, ক্লীব ভয়-শাসিত ও উৎকণ্ঠা-ব্যাকুল পৌরুষহীন সমকালীন সমাজের ধ্বংস কামনা করেছেন নজরুল এবং সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে সুষম নতুন সমাজ গড়ার জন্য যুবশক্তির উত্থান কামনা করেছেন। ১৭
‘নটরাজ শিবই নজরুল ইসলামের মিথ বলয়ের কেন্দ্রবিন্দু এবং তার মর্মকোষ ও অস্তিত্বমূল উৎসারিত অভীপ্সার প্রত্নপ্রতিমা।১৮
এই প্রত্নপ্রতিমা সৃজিত রূপটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অভ্যন্তরে কতোটা জুড়ে আছে এবং নটরাজ শিব কতোটা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে, তা উদ্ধৃতির মাধ্যমে দেখানো যাক।
ক. মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজ টিকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
খ. মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন,
আমি ধ্বংস, আমি মহাভয় আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
গ. আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
ঘ. আমি নৃত্য পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
ঙ. আমি-ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
চ. আমি পিনাক পাণির ডমরু ত্রিশূল ..
ছ. আমি আকুল-নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি।১৯
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুলোতে শিব-এর নানা রূপ, নানা প্রতীকাভাসে মুদ্রিত হয়েছে; যা নজরুলর অভীপ্সার পরিপূরক। এখানে নজরুল নিজেকেই শক্তিমানের প্রতীক ভাষ্যে নির্মাণ করেছেন। যার জন্য এই দীর্ঘ কবিতাতে ‘আমি’ শব্দের এত বিপুল ব্যবহার। নটরাজ শিব যেহেতু ধ্বংস ও সৃজনের দেবতা এবং শক্তির প্রতীক, তাই নজরুলর মানস-প্রতীক পুরুষ হয়ে উঠেছে শিব। শুধু বিদ্রোহীতেই নয়, শিব মিথ নজরুলর চেতনাসার হিসেবেও কাজ করেছে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার সর্বত্র নজরুল আত্মন এবং অহংকে যেভাবে সংবর্ধিত করেছেন, তাঁর প্রকাণ্ড আমিত্বকে প্রকাশের জন্য যে-বিস্তৃত আয়োজন করেছেন, তাতে এর মূল সুরটি এক প্রবল প্রচণ্ড বিদ্রোহের বলে সহজে শনাক্ত হয়। দ্বিমতের অবকাশ নেই যে, এই কবিতায় নজরুল তাঁর পরশুরাম-সদৃশ বিপ্লবী চরিত্রকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কবিতাটিতে কি শুধুই প্রতিবাদ, শুধুই আবেগ, নিরন্তর সংগ্রামের উদ্দাম সম্মুখযাত্রাকে চিত্রায়িত করা হয়েছেÑ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি চিত্রকল্পের কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো বললে অত্যুক্তি হবে না- নাকি নজরুল পাশাপাশি অন্য কোন সুর বাজিয়ে যাননি এই কবিতায়? … সমস্ত কবিতাটিতে যে স্তবক বিন্যাস, দীর্ঘ ও হ্রস্ব চরণের পারম্পর্য, সাঙ্গীতিক ছন্দের এবং সাঙ্গীতিক ভাষার প্রয়োগ (স্বরবর্ণ ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শিতার জন্য কবিতাটিতে লয় ও যতির সবিশেষ প্রয়োগ লক্ষণীয়, যে লয় ভাবকে বিশ্বস্তভাবে প্রকাশ করেছে) এবং সাধারণ অর্থে একটি পৌনঃপুনিকতার আবর্তনে যে মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে কবির, তাতে ভাষায় হঠাৎ অন্তর্ধানকে ঠেকাবার আগ্রহটাই যেন প্রবল। … বিদ্রোহীর একটি বৈশিষ্ট্য হল এর স্থাপত্যসুলভ কাঠামোটি, যেখানে সুমিতি ও সুষম্য প্রধান গুণ। … বিদ্রোহ শুধু বিষয়কে নয়, ফর্মকেও পরিবর্তন করে, বিদ্রোহের পূর্বশর্ত তাই একটি নতুন ফর্ম নির্মাণ। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল যে ফর্ম নির্মাণ করেছেন, তাতে ভাষার নানাবিধ দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, নীরবতা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে যতটা কাটিয়ে উঠেছেন এবং ভাষাকে সংগীতের স্তরে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে এর স্থায়িত্ব এবং স্থিতিস্থাপকতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। … নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সময়কে ব্যবহার করেছেন মুক্তির পথ হিসেবে; ‘আমি’র প্রকৃত পরিচয়টি আবিষ্কার করে, বিশ্বের সকল বহিঃস্থ বস্তুতে তাকে স্থাপন করে, তিনি শান্ত আমিত্ব অতিক্রম করে অনন্তে উত্থিত হয়েছেন।২০
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমি’ চেতনার বীর পুরুষর চিত্রকল্পময় উত্থানকে এমন এক ফর্মে ধারণ করেছেন, যা কেবল নব-সৃষ্টিই নয়, নজরুলের আগে এই ফর্ম আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। আর বিষয়ের বিদ্রোহও এই নতুন ফর্মকে নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছে যেন। ‘প্রলয়োল্লাসে’ যেমন তিনি কাল-বৈশাখীর ঝড়কে নতিনের কেতন’ বা নিশান বলছেন, যা বাস্তবোচিত নয় এবং অবিশ্বাস্যও; কিন্তু কবি কাল-বৈশাখীকে রূপকস্থিতি হিসেবে নৃত্যপাগল শিবের প্রতিমূর্তিতে রূপায়িত করেছেন। মাইকেল মধূসূদন যেমন তাঁর ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যে দেবতা রামচন্দ্রকে দেবময়তা দান করেননি। মহত্ব ও মহিমা, বীরত্ব ও দেশপ্রেম, মানবিকতা ও তার পুত্র শোকবিলাপ অর্থাৎ রাবণ চরিত্র থেকে ‘রাক্ষস’-এর গুণাবলি সরিয়ে মানবিক গুণাবলি আরোপ করে নতুন চিন্তাধারার সূচীমুখ সৃষ্টি করেছেন। নজরুলও সে-রকম ধ্বংসের কাল-বৈশাখীকে নতুনের নিশান হিসেবে চিত্রিত করে নতুন চিন্তার যেমন সূচনা করেছেন তেমনি বিষয় ও ফর্মকেও নতুন করে তুলেছেন।
‘এখন দেখা যাক, নটরাজের কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্য কবিতাটির মধ্যে উল্লিখিত হয়েছে। এখানে একটি ত্রিমাত্রিক আকার দেখা যায় : কবির কবিসত্তা, বিদ্রোহী বীর এবং নটরাজ। এই তিনটি সত্তাই মিলে-মিশে একাত্ম ও অভিন্ন হয়ে গেছে।
কবিতার প্রথম স্তবকেই ‘রুদ্র’র উল্লেখ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘রুদ্রমঙ্গল’ নামে তাঁর প্রবন্ধও এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। আলোচ্য কবিতায় আছে ‘রৌদ্র-রুদ্র-রবি’। রুদ্রর সঙ্গে বিদ্রোহী বীরের সমীকরণ এই ভাবে প্রদর্শিত হয়েছে : ‘মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে..’। রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন, ‘জ্বলে তাঁর রুদ্রনেত্র পাপ তিমিরে।’ রুদ্র মানে ‘রোদয়িতা’ (কুপিত ব্রহ্মার ভ্রূ-মধ্য থেকে নীললোহিত কুমাররূপে জন্ম নিয়ে তিনি ‘রোদন’ করেছিলেন, তাই নাম রুদ্র), যিনি ভীষণ ও ভয়ঙ্কর। বেদে ইন্দ্র ‘অগ্নি’ ‘কাল’-এর সঙ্গে রুদ্রর ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কথা উল্লিখিত আছে। পুরাণে রুদ্রই মঙ্গলময় শিব। শিবের সংহারমূর্তিও রুদ্র। শিবের অষ্টমূর্তির একটি হল-অগ্নি। শিব শিবকে বলা হয় নটরাজ। দ্বিতীয় স্তবকে নজরুল লিখেছেন : মহাপ্রলয়ের বা নৃত্যরত আমি নটরাজ; শিবেরই নামান্তর ধূর্জটি। স্তবকের শেষে আছে : ‘আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর।’ ধূর্জটি শব্দের অর্থ হল: ‘র্ধূ’ (=গঙ্গা) জটিতে (=জটায়) যাঁর। ‘এলোকেশে’ প্রয়োগটি লক্ষণীয়। তৃতীয় স্তবকের শেষে আছে : ‘আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর। ব্যোমকেশ শিবের অপর নাম। ব্যোম বা শূন্যে যার কেশ ছড়ানো। গঙ্গাকে ধারণ করবার জন্য যার জটাকলাপ প্রসারিত! ব্যোমে যাঁর চন্দ্র সূর্যাগ্নির রশ্মি-রূপ কেশ বর্তমান। অব্যবহিত পূর্ববর্তী চরণে আছে : ‘আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।’ এর পরবর্তী স্তবকেই আছে, ‘আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার’, ‘আমি পিণাক পাণির ডমরু ত্রিশূল। ..
স্পৃষ্ট ও প্রত্যক্ষভাবে শিব নটরাজের উল্লেখ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় এর বেশি আর কিছু নেই। কিন্তু সকলেরই জানা আছে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রত্যক্ষ দিক অপেক্ষা পরোক্ষ এবং অস্পৃষ্ট দিকটিই পরিশেষে মুখ্য স্থান পায়। রুদ্র-নটরাজ- ধূর্জটি-ব্যোমকেশের প্রত্যক্ষ অনুষঙ্গ (প্রলয়, আগুন, জল [গঙ্গা থেকে], নাচন, ধ্বংস, শব্দ বিষ জ্বালা) এই কবিতায় নানা উপপ্রসঙ্গের সৃষ্টি করেছে এবং কবিতার Infrastructure-এর মধ্যে অনুসৃত হয়েছে। … মূল চিত্রকলা (গড়ঃযবৎ ওসধমব) থেকে সন্তানরূপী উপপ্রসঙ্গগুলি উৎসারিত হয়েছে। এইখানেই কবিতাটির সংহতি ও সামগ্রিক Exponence ধরা পড়ে।’২১
নটরাজ মিথ কল্পনার অনুস্বঙ্গ মিথগুলোর ব্যবহারও এ কবিতার মৌলিক চিন্তাসূত্রের সঙ্গে গ্রথিত। অন্যান্য মিথ প্রকল্পনার উল্লেখ করা যাক :
ক. আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
খ. আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
গ. আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাশা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
ঘ. তাজি বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মত হ্রেষা হেঁকে চলে!
ঙ. আমি ছিনিয়ে আনিব বিষ্ণুবক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
চ. আমি পরশু রামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
ছ. আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে একে দিই পদচিহ্ন,
জ. আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুংকার
ঝ. আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী :
ঞ. আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী
ট. ধরি বাসুকির ফণী জাপটি,
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি !
ঠ. আমি ধূমকেতু-জ্বালা বিষধর কালফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিমালায় নজরুলর নটরাজ শিব মিথকল্পের নানান রূপের সঙ্গে অনুষঙ্গ মিথের, ইসলামী মিথ ও ধর্মানুষঙ্গ-উপাদান যুক্ত হয়েছে। এ- কবিতায় ইতিহাস খ্যাত বেদুঈন আর চেঙ্গিসের রূপকল্পাও মিথিক পারম্পর্য থেকে নেয়া হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের নটরাজ মিথকল্প ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘বিদ্রোহী’তে যে ঘনসংবদ্ধ চৈতন্যের রূপায়ন ঘটেছে, এ-বইয়ের অন্যান্য কবিতায় তেমনভাবে আসেনি। প্রলয়োল্লাসে আবাহন হয়েছে নটরাজ শিব-এর আর ‘বিদ্রোহী তে যেন তার রূদ্রময় তাণ্ডব-সংহারমূর্তি এলোকেশে অকাল বৈশাখীর’ পর হিমাদ্রির মতো মাথা তুলে শান্ত হয়ে পড়েছে।
‘অগ্নি-বীণা’র অন্যান্য কবিতায় রুদ্ররূপ শিব-এর রূপকল্প লক্ষ করার পাশাপাশি অন্যান্য মিথশিল্প অন্বেষণ করা যাক।
‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতাটি চণ্ডী-চেতনার, জাগরণমূলক। কবিতায় মৌলিক থিম লোকপুরাণের দেবী চণ্ডী এবং নেশা-ভাঙ-খোর ভোলানাথ অর্থাৎ শিব-এর অচেতনাকে চেতনে ফেরাবার আহ্বান। কেননা, দুর্গা বা পার্বতীর চণ্ডরূপই হচ্ছে চণ্ডী। অতএব সে দনুজ দলনী, অশিব-নাশিনী চণ্ডীরূপ’ আজ খুবই প্রয়োজন। কারণ শাসনে-শোষণে অসুর শক্তি আজ কবির চারপাশের জনজীবনকে নগ্ননিষ্ঠুরতায়, অন্যায়-অত্যাচারে রক্তাক্ত করে ফেলেছে।
শিব যেখানে সৃষ্টির ও সৃষ্টির রক্ষক, সে আজ নিদ্রিত, অসংযত। এ-রূপ কবির পছন্দ নয়। তাই তিনি ক্ষুব্ধ স্বরে উচ্চারণ করেন :
নিদ্রিত শিবে লাথি মার আজ,
ভাঙ্গো মা ভোলার ভাঙ-নেশা
পিয়াও এবার অ-শিব গরল
নীলের সঙ্গে লাল মেশা।
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অ-শিব নাশিনী চণ্ডীরূপ;
দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ।
শ্বেত শতদল-বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বর ধারিনী মা
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।
[রক্তাম্বর ধারিণী মা]
এখানেও শিব মিথের সৃষ্টিক্ষমতা শিব-এর ভিন্নরূপ গাঁজা ভাঙ-খোর লৌকিক দেবতা ভোলা এবং তার পত্নী চণ্ডীর মধ্যে আরোপিত হয়েছে। দনুজ-দলনী চণ্ডীকে ধ্বংসের বুকে সৃষ্টির পূর্ণিমা আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেননা, বাস্তবে ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষ ও তার তেত্রিশ কোটি মানুষ চরমভাবে নিগৃহীত, নিপীড়িত ও পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে নিয়তই শোষিত হচ্ছে। এই শাসকরূপ অসুরদের দমনের জন্য তিনি চণ্ডীকে রক্তাম্বর ধারণ করতে বলছেন।
‘আগমনী’ কবিতাটিও দেবী আবাহন। কিন্তু এ দেবীকেও অসুর নাশ করতেই আহ্বান জানাচ্ছেন নজরুল। এবং এ-কবিতাতেও রুদ্র শিব মৌল চেতনার আধার।
নাচে ধূর্জটি সাথে প্রমথ বম্ বম্ বম্
লাল লালে লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
ওঠে ওঙ্কার, রণ-ডঙ্কার,
নাদে ওম ওম মহাশঙ্খ- বিষাণ রুদ্রর।
এ যে নৃত্য-পাগল শিব-এর রূপ, তা সহজেই ‘ধূর্জটি’, ‘ঈশান’ ‘রুদ্র’ শব্দ- ত্রয়েই পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু মিথ-পূর্বকল্পনাই নয়, ‘ঈশান’ শিব-এর প্রতীক হলেও ‘ঈশান কোণ’ও। ফলে ভারতবর্ষের পশ্চিম-উত্তর ঈশান কোণ বরাবর ‘লাল লালে লাল ঈশানে নিশান’ বলা হলে সোভিয়েত বিপ্লবের ইঙ্গিতটিও মনে পড়ে। পরের চরণে ‘ওঠে ওঙ্কার রণ-ডঙ্কার’ স্মরণ করিয়ে দেয় সোভিয়েত বিপ্লবের বিশ্ব বিস্তার কামনার রণসজ্জা কিংবা কৌশল-বাজনা।
এ-কবিতার এক জায়গায় ‘শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর।’ পড়ে মনে হয় দেবীর মহিষাসুর দমনের রূপকল্প। এবং তারপরই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে মানুষের কথা-
নাই দানব
নাই অসুর
চাইনে সুর
চাই মানব!
অর্থাৎ কবি কোনো দানব-অসুর ও সুর বা দেবতা চান না, চাইছেন মানুষ। ‘মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ এই সত্য-সুন্দর আর শাশ্বত বোধই ‘আগমনী’তে ফুটে উঠেছে। এ-ছাড়া কবির সমকালীন জীবন পরিবেশ-প্রতিবেশের রাজনৈতিক অভীপ্সাও মূর্ত হয়ে উঠেছে সর্বশেষ লাইনের ‘বন্দে- মাতরম’ ধ্বনিতে। ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধ জনগণের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ ছিল নজরুলের সমকালে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের অগ্নিদীক্ষিত শ্লোগান-ধ্বনি। সেই ধ্বনি যখন দেবী আবাহনে উচ্চারিত হয়, তখন উপলব্ধ হয় যে কবির দেবী আবাহনের পেছনে সংগুপ্ত রয়েছে তাঁর অভীপ্সাজাত স্বাধীনতার বাণীচিত্র।
‘ধূমকেতু’ কবিতার মৌলিক চেতনা ‘আমি’ পুরুষর উজ্জীবন; এখানে কবি শক্তির নবতর প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন এমন এক উপাদান-উপকরণ, যা মানববিশ্বের জানা থাকলেও, তা মানুষের অধীন শক্তি নয়। ‘ধূমকেতু’ কোনো মিথিক উপকরণও নয়- বাস্তব, মহাকাশচারী, জ্যোতির্মন্ডলে নিয়ত চক্কর-খাওয়া এক প্রজ্জ্বলন্ত ধাবমান শিখার অস্তিত্ব। এ- ধূমকেতু যুগে যুগে আসে। এই যেমন ‘হেলির ধূমকেতু’ আমরা বহুবছর পর কয়েক যুগ আগে পৃথিবীর কাছে দিয়ে যেতে দেখেছি। ধূমকেতু ধুম-ধূলি আর পরমাণু কণা প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিময়। কোনো ধূমকেতুর আঘাত যদি লাগে এই পৃথিবী নামক গ্রহে, তাহলে এ-বিশ্ব জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবীর জন্য ধূমকেতু তাই ত্রাসের কারণ। নজরুল পৃথিবীর ত্রাস শক্তিকেই নিজের উপমান হিসেবে চিত্রিত করেছেন এবং উপস্থাপিত করছেন তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধ। এবং তিনি ধূমকেতুর আগমনকে বিপ্লবের প্রতীক রূপক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কেননা, তিনি বিশ্বাস করতেন শাসক ইংরেজদের বিরুদ্ধ ধ্বংসাত্মক বিপ্লব ছাড়া এ-দেশ থেকে তাদের শেকড় উৎপাটন করা যাবে না। তিনি চান ঔপনিবেশের অবসান হোক বিপ্লব ধ্বংসের মাধ্যমে।
আমরা লক্ষ্য করবো ‘ধূমকেতু’ ‘পার্থিব’ কিন্তু মহা জাগতিক বিষয় হলেও নজরুলের প্রত্যাশিত মৌল শক্তি প্রতীক শিব-এরই ‘রূপকে’ উদ্বোধিত হয়েছে।
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত সাতশ’ নরক-জ্বালা জ্বলে মম ললাটে!
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘনঘোলাটে!
[ধূমকেতু]
নজরুল নিজেকেই ‘ধূমকেতু’ বলছেন এবং যুগে যুগে সেই ধূমকেতু মহাবিপ্লবের কারণে আসে। আর এই ধূমকেতু বা স্বয়ং নজরুলই স্রষ্টার শনি অর্থাৎ ‘মহাকাল’ ধূমকেতু। মহাকাল শিব-এরই নামান্তর। এবং বলছেন শিবের তিন নয়নই ঘনঘোলাটে রঙে পূর্ণ করেছে ধূমকেতু অর্থাৎ স্বয়ং কবি। অর্থাৎ নজরুল মানসে শিব মিথ শক্তির সহায়ক শক্তি জ্যোতির্মন্ডলে ঘূর্ণায়মান ধূমকেতু। মিথ শক্তির সঙ্গে প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক। যা পরমাণু কণায় পূর্ণ ও প্রজ্জ্বলন্ত এবং নিয়ত চলমান, বেগবান ধূমকেতুকে সমীকরণ করার মানে হচ্ছে পুরাণের শক্তির সঙ্গে জাগতিক শক্তির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটানো। নজরুল ইসলাম সে কাজে পারদর্শী এবং নিয়তই পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যিক, ধর্মীয় ও মহাজাগতিক শক্তি বলয়ের মধ্যে সমন্বয়-সৃষ্টি করেন।
ঐ বামন বিধি সে আমরে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত,
মম অগ্নি-দহনে জ্বলে পুড়ে তাই ঠুটো সে জগন্নাথ!
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি
আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তা ও !
তাই বিপ্লব আনি, বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফ তাও।
[ধূমকেতু]
উদ্ধৃতাংশের প্রথম বাক্যে পরোক্ষে রয়েছে ‘ধূমকেতু’র অগ্নিময় পটচিত্র। কেননা, বামন বিধি, অর্থাৎ যার হাত আকাশের চাঁদ ধরতে পারে না- সেই ধূমকেতু সদৃশ নজরুলকে ধরতে হাত বাড়িয়েছিল, কিন্তু সে জ্বলে পুড়ে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় পংক্তিতে স্রষ্টার ফাঁকি ও সৃষ্টির চাতুরী ধরতে পেরেছেন কবি। এখানে আর ধূমকেতুর কোনো রূপ নেই। পুরোপুরিই ব্যক্তি মানুষের বোধ ও তার অন্তর্গত চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে বিধাতার বুকে হাতুড়ি মারছে সেই রোষাক্রান্ত কবি চৈতন্য। এই বিধাতা ভুয়ো, মিথ্যা, নকল; সত্য নয় সে; অবৈধ দখলদার, শোষক ও অত্যাচারী-নৃশংসতার প্রতীক। একে উৎখাত করতে নজরুল ‘তাই বিপ্লব’ আনেন, ‘বিদ্রোহ’ করেন।
‘ধূমকেতু’ কবিতার কেন্দ্রীয় মিথ চরিত্র শিব এবং নটরাজ শিব এবং ক্ষ্যাপা মহেশ, ব্রহ্মা, ভবানী বৈশ্বানর, প্রলয়ংকর, রুদ্র, কালনাগ- সকল কিছুই কেন্দ্রীয় শিব চরিত্রের মত্ত শক্তির উদ্বোধক।
গ্রিক ও তুরস্কের মধ্যে যে যুদ্ধ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ, নজরুল ইসলাম, তুর্কি জাতীয়তাবাদী বীরবাহু কামাল আতাতুর্ককে নিয়ে কামাল পাশা কবিতা লেখেন, যা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতোই জনপ্রিয় হয়েছিল। কামাল পাশা শত্রুদের হারিয়ে দিয়ে নতুন তুরস্কের ভিত্তি গড়েন কুড়ি শতকের-এর দশকের গোড়ার দিকেই। সেই বিজয় গাঁথাই এ-কবিতার বিষয়বস্তু। কিন্তু নজরুল কামাল আতাতুর্কের বিজয়কে বাণীবদ্ধ করতে চাইলেও তাঁর অন্তরাত্মার প্রত্যাশা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথাটি উঠে আসে প্রবল বেগে। নাট্যধর্মী এই কবিতায় তিনি এক জায়গায় লিখেছেন,
কে মরেছে? কান্না কীসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপনারই জান শেষ করেছে!
বেশ করেছে!!
শহীদ ওরাই শহীদ
বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে, খুন ওদেরি লোহিত!
শহীদ ওরাই শহীদ!!
দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে তারা শহীদ। ‘শহীদ’ শব্দটি বাঙালির জন্য মিথিক। কেননা, বাঙালির সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে, তার প্রত্যাশার সঙ্গে শহীদী মিথ- ইতিহাস-আক্রান্ত হলেও, ইতিহাসের বলয় ভেদ করে সর্বজনীন সংগ্রামীর প্রতীকে উত্তরিত হয়েছে।
এ-কবিতায় রুদ্র-শিব-এর ব্যঞ্জনা লক্ষ করা যায়, কামালের তেজোদীপ্ত উত্থানের মধ্যে। পুরোনো তুরস্কের জঞ্জাল সাফ করে নব্য-আধুনিক গতিশীল তুরস্ক নির্মাণের যে সৃজন-দর্শন, যদি বলা হয় যে, তা চিন্তাশীল বা সৃষ্টিক্ষম কামাল আতাতুর্কের, তা যেমন ঐতিহাসিক সত্য তেমনি কাজী নজরুল ইসলাম যেন কামালের মধ্যে ধ্বংস আর সৃষ্টির উপকরণ-উপাদানই প্রত্যক্ষ করেছেন। আর সে কারণেই সুদূর তুরস্কের কামালকে উপজীব্য করেছেন কবিতায়।
‘আনোয়ার’ কবিতাটিও নাট্যধর্মী এবং নজরুলর স্বাধীনতা চেতনার বীরত্ব বোধের উদ্বোধনী চেতনার পরিপূরক। জুলুমবাজ সরকারের কারাগৃহ ও প্রহরীদের নিষ্ঠুরতা কেমন হতে পারে, এ-কবিতায় তা ফুটে উঠেছে। এ কবিতার কারাগারের পটভূমি নজরুলর কারা-জীবনের অভিজ্ঞতাজাত; তা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। ‘রণ-ভেরী’ কবিতার পটভূমি ভারতবর্ষ হলেও তুর্কি কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হতে দশ হাজার স্বেচ্ছা সৈনিক পাঠানোর প্রস্তাব শুনে লিখিত হয়েছিল। ‘ওরে আয়/ ঐ মহাসিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়/ ওরে আয়!’ এই আহ্বান কার উদ্দেশ্যে, সেটা জানা না গেলেও, স্বাধীনতা সংগ্রামী কামাল পাশার জন্য নজরুলর মন-প্রাণ ছিল সব সময় তৈরি। তাঁর মনে যে ‘স্বাধীনতাই মৌল- ভাবসম্পদ- এ-কবিতার অন্তিমে সেটা জানা যায়, যখন লেখেন, ‘মোরা অসি বুকে বরি’ হাসি মুখ মরি, ‘জয় স্বাধীনতা’ গাই’ তখন সত্যি সত্যি তার কল্পনার কেন্দ্রভূমিকে যেন স্পৃর্শ করা যায়। মিথ কেন্দ্রিয় চরিত্র নটরাজ এ কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছেÑ
নাচ্ তা তা থৈ থৈ তা তা থৈ থৈ-
থৈ তাণ্ডব আজ পাণ্ডবসম খাণ্ডব-দাহ চাই
[রণ-ভেরী]
নটরাজ শিবের পাগল-পারা নাচ তাতা থৈ থৈ আর সেই নাচের ফলেই অর্থাৎ ধ্বংস নৃত্যের তাণ্ডব যেন পাণ্ডবদের খাণ্ডব-দাহ-এর মতো। খাণ্ডব-দাহ করেন মূলত ‘অগ্নি’। অগ্নিকে সাহায্য করেন কৃষ্ণ ও অর্জন। পনেরো দিন ধরে খাণ্ডব বন আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করেন তারা। এতে বনের সকল পশুপাখি মারা পড়ে, শুধুমাত্র ময় দানব, তক্ষক নাগের পুত্র অশ্বসেন, ও চারটি মাত্র শার্লক পক্ষী রক্ষা পায়।২২ নজরুল প্রত্যাশা করছেন মহাসিন্ধুর ওপারের তুরস্কের শত্রু যেন বিনাশ হয় খাণ্ডব বনের মতো পুড়ে ছারখার হয়। আর কৃষ্ণার্জুনের মতো শক্তিধর কামাল পাশার যেন জয় হয়।
‘খেয়াপারের তরণী’ ইসলামী মূল্যবোধ ও যাপিত জীবনাচারের চমৎকার কাব্যময় রূপ। এ-কবিতায় নটরাজ শিব মিথকল্প, ইসলামী মিথ ঐতিহ্য, ইসলামের চার খলিফা, আল্লাহর মহিমা ইত্যাদির সংমিশ্রণে সৃষ্টÑ
ক. তমসাবৃতা ঘোরা ‘কিয়ামত’ রাত্রি,
খেয়া-পারে আশা নাই, ডুবিল রে যাত্রী!
দমকি দমকি দেয়া হাঁকে, কাঁপে দামিনী,
শিঙ্গার হুঙ্কারে থরথর, যামিনী !
লঙ্ঘি’ এ সিন্ধুরে প্রলয়ের নৃত্যে
ওগো কার তরী ধায় নির্ভীক চিত্তেÑ
অবহেলি জলধির ভৈরব গর্জন
প্রলয়ের ডঙ্কার ওঙ্কার তর্জন!
খ. আবুবকর উমান উমর আলী হায়দর
দাঁড়ি যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ডর
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা
দাড়ি-মুখে সারি-গান লা-শরীক আল্লাহ!
[খেয়া-পারের তরণী]
‘কোরবানী’ কবিতায় দু’জায়গায় আছে ‘রুদ্র’ শব্দটি। ‘রহমান কি রুদ্র নন? আর ‘রেখেছে আব্বা ইব্রাহিম সে আপনা রুদ্র পণ!’ অর্থাৎ মিথপ্রবণ মন ইসলামী বিষয় কেন্দ্রিক কবিতায়ও হিন্দু মিথশক্তির ব্যবহার করেছেন। মূলত সর্বত্রই তিনি অন্বেষণ করেছেন শক্তির, সত্য-শক্তির ন্যায়ের বীর্যবানের প্রতীক-
আজ জল্লাদ নয় প্রহ্লাদসম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
‘মোহররম’ কবিতার ঐতিহাসিক পটভূমি ঐতিহাসিক সত্য। কি নিষ্ঠুর আর নির্মমতার রক্তাক্ত ইতিহাস ইয়াজিদ বিন মোয়াবিয়া সৃষ্টি করেছে পৃথিবীর এবং ইসলামের আদি ইতিহাসে সেই মর্মন্তুদ ঘটনা প্রবাহের ওপর রচিত নজরুলর ‘মোহররম’ কবিতা। বিষয় ঐতিহাসিক হলেও এর বাস্তব প্রতিক্রিয়া মানব-মনে এমন এক আবহ সৃষ্টি করে, যা মিথ পরম্পরায় পরিব্যাপ্ত। ইতিহাসকে ছাপিয়ে ওই রক্তাক্ত ইতিহাস সমর্পিত হয়েছে রাজনৈতিক ও ক্ষমতালিপ্সার মিথ-সংস্পৃর্শে।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...