শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

হাইমে সায়েনসের দুটি কবিতা

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ২৭৮ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন

অনুবাদ ও ভূমিকা : আলম খোরশেদ

গত শতাব্দীর বলিভীয় সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, শিক্ষক ও চিত্রকর হাইমে সায়েন্স গুজমানের জন্ম, বেড়ে ওঠা, কর্ম ও প্রয়াণ সবই রাজধানী লা পাস শহরে। কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে প্রথম যৌবনেই সায়েনস জার্মানি সফর করেন, যেখানে তিনি পরিচিত হন হেগেল, আর্থার শোপেনহাওয়ার, মার্টিন হাইডেগার, টমাস মান, ফ্রানৎস কাফকা প্রমুখ প্রভাবশালী সাহিত্যিকের জীবন, লেখালেখি ও চিন্তার সঙ্গে, যা তাঁর মনোকাঠামোয় গভীরতম অভিঘাত ফেলে। দেশে ফিরে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৪৪ সালে সায়েনস Cornamusa নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করেন, যাকে ঘিরেই মূলত তাঁর কবিতার অব্যাহত স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে। এরই ফলাফল ১৯৫৫ ও ১৯৫৭ সালে পরপর তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ The Scalpel ও Death by Touch-এর প্রকাশ। কয়েক বছরের ব্যবধানে বহুপ্রজ সায়েনসের আরো তিনটি কবিতার বই A nniversary of a Vision (১৯৬০), Immanent Visitor (১৯৬৪) ও The Cold (১৯৬৭) প্রকাশিত হয়। তাঁর কবিতা মূলত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বৈশিষ্ট্য, জটিল ও সূক্ষ্ম সাংকেতিকতা ও পরাবাস্তববাদী চরিত্রের জন্যই সমধিক পরিচিত ও আলোচিত।

কবিতা রচনার পাশাপাশি হাইমে সায়েনস পত্রিকা প্রকাশ, প্রখ্যাত বলিভীয় লেখক ও সমাজচিন্তক আলসিদেস আরগুয়েদাসের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সন্দর্ভ রচনা, শিক্ষকতা, নাট্যপ্রযোজনা, চিত্রপ্রদর্শনী, বক্তৃতা, সাহিত্য-আড্ডা, কবিতা কর্মশালা ইত্যাদিও সমান তালে অব্যাহত রাখেন। তাঁর গদ্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে দুটি উপন্যাস, বেশ কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন এবং তিনটি নাটক। সায়েনসের শেষজীবনে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে তিনটি কাব্যগ্রন্থের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : The Darkness (১৯৭৮), When a Comet Passes (১৯৮২) ও The Night (১৯৮৪)।

অতিরিক্তি মদ্যপান ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলে ১৯৮৬ সালে ৬৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

 

নদীর বয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে

লিওনার্দো গার্সিয়া পাবোনের জন্য

যখন সময় আসবে, নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে,

তার বয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে

আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব।

তোমার মুখরেখা, তোমার কণ্ঠের প্রতিধ্বনির সঙ্গে, আমার কণ্ঠকেও গভীরতর কোনো কন্দরে,

সেই বিপুল পরিসরে, যাকে দেখেছে মৃত্যুর চোখ,

প্রতিধ্বনিত করা গেলেই কেবল তুমি গোপন শব্দটিকে জানতে

পারবে।

 

যেখানে বাতাস স্থাণু। যেখানে জীবন সাঙ্গ হয়েছে এবং সব রংই

একরকম।

যেখানে জলকে স্পর্শ করা হয়নি, যেখানে মাটিকে স্পর্শ করা হয়নি : আমার অদৃশ্য অস্তিত্বের গভীরে,

যেখানে তুমি জানো তোমার স্থান, সহস্র বছরের বর্তমানে … কাজের, ঘ্রাণের, আকৃতির;

সময়ের ভেতরে বিরাজমান প্রাণী, খনিজ ও বৃক্ষের।

সময়ের মধ্যে, সময় দ্বারাই গঠিত। পূর্ব আশঙ্কার শেকড়ের

গভীরে।

বীজের মধ্যে, যন্ত্রণার মধ্যে,

একমাত্র তুমিই জানবে সেই গোপন শব্দটিকে।

 

পৃথিবীর একাকিত্ব। মানবের একাকিত্ব। মানুষ ও পৃথিবীর অস্তিত্বের কারণ …

গোলকের বৃত্তাকার নিঃসঙ্গতা।

 

উত্থান পতন

 বিপুল, অপরিমেয় … অসমঞ্জস সমাধি, শূন্য ও অবিভাজ্য।

অন্ধকার নগরীর অনেক উঁচুতে

কোনো এক রাতে অন্ধকার নগরীর অনেক উঁচুতে,

বৃষ্টি-চকচকে কোনো রাস্তায়

যার কোলাহল এখন দূরবর্তী,

আমি নিশ্চিত সে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে

আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলব

দীর্ঘক্ষণ তার হাত ধরে রেখে বনের ভেতরে

তার চোখ ছুটন্ত ধূমকেতুর মতো স্বচ্ছ

তার মুখ সমুদ্র থেকে উঠে আসা, তার চোখ আকাশে, আমার

কণ্ঠস্বর

তার কণ্ঠস্বরের মধ্যে,

তার মুখগহ্বর আপেলাকৃতির, তার চুল

স্বপ্নাকৃতির

দুই চোখের মণিতে এমন এক দৃষ্টি, যা এর আগে কখনো

দেখা যায়নি

তার চোখের পাপড়িতে আলোর ঝরনা, আগুনের ধারাপাত

এর সবই আনন্দে উদ্বেল আমার নিজস্ব হয়ে যাবে

আমি তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের জন্য একেকটি হাত কেটে দেব

আমি তার প্রতিটি হাসির জন্য একটি করে চোখ উপড়ে নেব

আমি মরে যাব, একবার দুবার তিনবার চারবার সহস্রবার

কেবল তার ঠোঁটের ওপর মৃত্যুবরণ করব বলে

আমি করাত দিয়ে পাঁজর চিরে ফেলব, তার হাতে আমার হৃৎপিণ্ড তুলে দিতে

আমি সুই দিয়ে আমার উৎকৃষ্ট আত্মাটিকে বের করে আনব

তাকে শুক্রবার সন্ধ্যাগুলোতে বিস্মিত করে দেব বলে

যখন গান গাইছে রাতের বাতাস, আমি তার সান্নিধ্যের

মাধুর্যে

তিনশ’ বছর বাঁচবার প্রস্তাব করছি।

 

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...