সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ন

বালক : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ৩০ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

বয়স তখন ছিল কাঁচা–হাল্কা দেহখানা
ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।
উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলোর ঝাঁক,
বারান্দাটার রেলিং ’পরে ডাকত এসে কাক।
ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে
তপ্সি মাছের ঝুড়িখানা গামছা দিয়ে ঢেকে।
বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের ’পরে দাদা,
সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হতো তাঁর সাধা।
জুটেছি বউদিদির কাছে ইংরেজি-পাঠ ছেড়ে,
মুখখানিতে ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লাল-পেড়ে।
চুরি করে চাবির গোছা লুকিয়ে ফুলের টবে
স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে।
কিশোরী চাটুজ্জে হঠাৎ জুটত সন্ধ্যা হলে–
বাঁ হাতে তার থেলো হুঁকো, চাদর কাঁধে ঝোলে।
দ্রুতলয়ে আউড়ে যেত লবকুশের ছড়া–
থাক্ত আমার খাতা লেখা, পড়ে থাকত পড়া;
মনে মনে ইচ্ছা হতো, যদিই কোনো ছলে
র্ভতি হওয়া সহজ হতো এই পাঁচালির দলে,
ভাব্না মাথায় চাপত নাকো ক্লাসে ওঠার দায়ে,
গান শুনিয়ে চলে যেতুম নতুন নতুন গাঁয়ে।
স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে
হঠাৎ দেখি, মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, রাস্তা ভাসে জলে–
ঐরাবতের গুঁড় দেখা দেয় জল-ঢালা সব নলে।
অন্ধকারে শোনা যেত রিম্ঝিমিনি ধারা,
রাজপুত্র তেপান্তরে কোথা সে পথহারা।
ম্যাপে যেসব পাহাড় জানি, জানি যেসব গাঙ,
কুয়েন্লুন আর মিসিসিপি ইয়াংসিকিয়াঙ–
জানার সঙ্গে আধেক জানা, দূরের থেকে শোনা,
নানা রংয়ের নানা সুতোয় সব দিয়ে জাল বোনা,
নানারকম ধ্বনির সঙ্গে নানান চলাফেরা,
সব দিয়ে এক হাল্কা জগৎ মন দিয়ে মোর ঘেরা,
ভাব্্নাগুলো তারই মধ্যে ফিরত থাকি থাকি–
বানের জলে শ্যাওলা যেমন, মেঘের তলে পাখি।

শান্তিনিকেতন
আষাঢ় ১৩৪৪

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...