শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন
একুশ রকম মুখভঙ্গি
ইদানীং শরীরটা ভালো যাচ্ছে না,
তাই বন্ধুরা প্রায়ই দেখতে আসে।
গতকাল পর পর একুশজন এসেছিল—
একুশ রকম মুখভঙ্গি।
কারো সঙ্গে স্কুলের বেঞ্চ,
কারো সঙ্গে কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়।
অনেককেই ঠিক চিনতে পারিনি,
যদিও সবার মুখ প্রায় এক,
এক্সপ্রেশন আলাদা।
আজ যে দেখতে এসেছে
সে বলছে—
গতকাল সে আসেনি।
তবে কি মস্তিষ্কে হয়েছে গোলমাল?
এক বন্ধু সান্ত্বনার সুরে বলে—
এখন কাউকে বিশ্বাস করো না,
এসব এআই দিয়ে বানানো।
তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে
স্ত্রীর দিকে তাকালাম।
স্ত্রীর ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে
মুখ ফিরিয়ে নিলাম—
ভাবলাম,
আসল স্ত্রী যদি দেখে ফেলে
এই মুহূর্তে যাকে দেখছি,
সেও যদি বলে—
“আমি কিন্তু এআই না!”
২
বিবলিওফোবিয়া
বই দেখলেই আমি কুঁকড়ে যাই-
জলাতঙ্ক রোগীর মতো।
ওরা নাকি পানিতে কুকুর দেখে,
আমি বইয়ে দেখি
গাছে করাতের দাঁত।
বুক ধড়ফড় করে।
মনে হয়
পাতার ভেতর থেকে
মাইট বেরিয়ে এসে
আমাকে মারবে।
বই লেখা হয়
হৃদয়ের রক্তে।
বই লিখতে
কাগজ লাগে না।
অতীত থেকে মানুষ
নাবলা গল্প নিয়ে
বুকের কাছে আসে,
আর কিছু কঠোর আত্মা
নিজেদের রক্ত
কাগজে ঢেলে দেয়।
বই মানে
গাছের গলিত শব।
বইয়ের কাছে গেলে
ওরা কামড়াতে আসে—
পথের বেওয়ারিশ কুকুরের মতো।
আমি বই দেখলে পালাই,
বই আমাকে খেতে আসে।
৩
লেবু, ব্লিচিং আর তুমি
তুমি এখনো নদীকুলে বসে রবীন্দ্রনাথ পড়ো
পোস্টমাস্টার রতনের সম্পর্ক কথায়
কেজো লোকেরা বলে,
দ্বারকানাথের ছিল বোথেল—
তাতে কী আসে যায়
যারা রুমির আত্মার প্রেম নিয়ে
উপন্যাসের ভেতর ঘর বাঁধে
যারা হাফিজ, খৈয়াম, শেক্সপিয়ার পড়ে
নজরুল, জসীমউদ্দিন, ফররুখ—
নামের ভিড়ে
কেউ মাহমুদ কেউ রাহমান
প্রতি সেকেন্ডে তুমি ভাঙছ, ভাগ হচ্ছ
তবু তোমার কথার গায়ে
পুরনো দিনের দাগ
তুমি লেবু, ব্লিচিং ঘষছ
কিন্তু কিছু দাগ
উঠে না
ওগুলোই থেকে যায়।
৪
দাম অভিন্ন
তুমি পাল তোলো
পাল নামাও।
একবার উঠো নৌকায়,
আবার নামো নিচে।
সেখানে মাঠ আছে,
মাঠে ধানের শীষ।
পাখিও পাখির ওপর ওঠে,
মানুষও মানুষের ওপর।
তুমি গর্ভ থেকে গর্ভে ঢোকো,
তোমার জন্ম শরীরের নিচে।
সবই তো একই দামের,
তবু তুমি তারও দাম চাও।
আমার কাছে পয়সা নেই,
একটা খেজুরের আঁটিও না।
অন্যত্র যাও—
বিক্রি করো।
৫
দূরত্ব
তুমি গর্দভদের বোঝাতে যেয়ো না—
ওরা ঘাসকেও মাংস বলে।
সবার অভিধানে সব শব্দ থাকে না,
অনেক জ্ঞানীও মূলত নির্বোধ।
তারা নির্বোধদের সঙ্গেই বিতর্ক করে,
অভিমান করে, রাগ করে—
কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারে না।
তোমার চলার পথে
যেমন সাপ-বিচ্ছু আছে,
কাঁটা আছে, ঢিলা পাথরও আছে;
তেমনি চলার পথে
গোলাপবাগানকেও এড়িয়ে যেতে হয়
তার কাঁটাও তোমাকে আটকে দিতে পারে।
গোলাপের সুগন্ধ নাও,
নির্বোধের মজাও নাও;
কিন্তু বেশি নিকটতর হয়ো না।
৬
দুই পৃথিবী
ধনী যখন গরিব বন্ধুকে প্রদর্শন করে,
তখনও তার যশ আর অর্থ বাড়ে।
ধনী ও গরিব—দুটি শ্রেণি;
গরিব হলো প্রকৃতি,
ধনী হলো সভ্যতা।
দুটোরই প্রয়োজন আছে।
নদী, সমুদ্র, মরুভূমি—
এই ধরিত্রীতে
কে ছোট, কে বড়,
আমি বলতে পারি না।
নারী–পুরুষ এক বিছানায় থাকলেও,
ধনী ও গরিব
দুই ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা।
তারা বন্ধু বা ভাই হলেও,
তাদের মন
সবসময়ই দূরত্বে থাকে।
৭
মৃত্যু
মানুষ মরে যাওয়াকে ভয় করে,
মরার চিন্তায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
প্রতিদিনের মৃত্যু দেখে
নিজেও একটু একটু করে মরে যায়।
সে ছিল না, সে এখন আছে—
সে হাঁটতে পারত না,
কথা বলতে পারত না,
মিলিত হতে পারত না।
দাড়ি ছিল না, গোঁফ ছিল না,
সাদা চুল ছিল না—
এই সব পরিবর্তনই যেন
মরে যাওয়ার আরেক নাম।
তুমি নিজের জীবনে
অনেকবার মরে যাও,
প্রতি মুহূর্তে মরতে থাকো।
তুমি কখনোই এক লোক নও।
আর যেদিন একেবারে মরে যাবে,
সেদিন সবাই দেখতে পাবে—
তুমি ছাড়া।
যে চূড়ান্ত মৃত্যুকে
তুমি নিজে দেখতে পাবে না,
তার জন্য অহেতুক ভেবো না।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...