শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ৫৪৮ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি

মুজফ্ফর আহমদ
বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি

কী করে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ও তারপর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সেকথাই বলছি। বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে কলকাতার একটি সাহিত্য সংগঠনের নাম ছিল ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। অনেকের সঙ্গে আমিও এ সংগঠনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। মুহম্মদ মোজাম্মেল হক সাহেব ছিলেন সমিতির সম্পাদক। তিনি কিন্তু ‘মোসলেম ভারত’-এর পরিচালক আফজালুল হক সাহেবের পিতা শান্তিপুরের মোজাম্মেল হক সাহেব নন। তার বাড়ি বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা শহরের নিকটবর্তী বাফ্তা গ্রামে। দুজনই কবি ও একই নামের ছিলেন বলে অনেক সময়ে বুঝতে ভুল হয়ে যায়। স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর মৌলভী আবদুল করীম ছিলেন সমিতির সভাপতি। আমি ছিলাম সমিতির সহকারী সম্পাদক।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা
বাংলা ১৩২৫ সালের বৈশাখ মাসে (১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মাস) সমিতির একটি ত্রিমাসিক মুখপাত্র বের হয়। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’। এ পত্রিকা যখন প্রথম বের হয় তখনও সমিতির অফিস ছিল ৪৭/১, মির্জাপুর স্ট্রিটের (এখন নাম সূর্য সেন স্ট্রিট) বাড়ির নিচতলার একটি ঘরে। সমিতির কাজ বেড়ে যাওয়ায়, তার উপরে পত্রিকাটি বের হওয়ায়, এই একটি ঘরে আর জায়গায় হচ্ছিল না। আমরা তখন বড়ো জায়গায় উঠে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকি এবং ৩২, কলেজ স্ট্রিটের দোতলায় রাস্তার দিকের অংশে বেশ বড়ো জায়গা পেয়ে যাই। এটা ১৯১৮ সালের শেষ দিকের কোনো একটি মাসের কথা। এ সময়েই আমি সমিতির সব-সময়ের কর্মীও হয়ে যাই। একজনকে সব কিছুর ভার নিয়ে না থাকলে আর কাজ চলছিল না। আমার সব-সময়ের কর্মী হওয়ার আগে কবি শাহাদাৎ হুসয়ন ও পাবনার আবু লোহানী সামান্য এলাউন্স নিয়ে কিছুদিন সমিতির অফিসে কাজ করেছিলেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে আমি সমিতির বাড়িতে থাকাও আরম্ভ করি।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সাহেব (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) ও মুহম্মদ মোজাম্মেল হক সাহেব ছিলেন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। শহীদুল্লাহ্ সাহেব তখনও বশিরহাটে ওকালতি করতেন। পত্রিকা-সম্পাদনার কাজে তিনি তেমন নজর দিতে পারতেন না। পরে অবশ্য তিনি ওকালতি ছেড়ে দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হয়ে আসেন। সে সময়ে তিনি কিছুদিন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র বাড়িতেও আমার সঙ্গে একই ঘরে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পরে তিনি মহামহোপাধ্যায় ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অনুরোধে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান।

৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টের (৪৯ঃয ইবহমধষর জবমরসবহঃ) কয়েকজন সৈনিক শুরু থেকেই, অর্থাৎ ১৯১৮ সালের এপ্রিল-মে মাস থেকেই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র গ্রাহক হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে পত্রালাপও করতেন। কাজী নজরুল ইসলামও এই পত্রালাপকারীদের একজন ছিল। আমি সমিতির সহকারী সম্পাদক ছিলাম ঠিকই, কিন্তু তার সব রকম কাজই আমার করতে হতো। পত্রিকার মোড়কগুলো আমি লিখতাম, পত্রিকার প্যাকেটগুলো ডাকে দিতাম আমিই এবং সমিতি ও পত্রিকাসংক্রান্ত সমস্ত চিঠিপত্রও আমাকেই লিখতে হতো। এমন কি পত্রিকার সামান্য সম্পাদনাও মাঝেমধ্যে আমায় করতে হতো। শহীদুল্লাহ্ সাহেবের কথা আমি আগে বলেছি। বিএ পাস করার পর থেকে মোজাম্মেল হক সাহেব খুব আন্তরিকভাবে সমিতির কাজ করছিলেন। তবে, তার সময় বড়ো কম ছিল। তিনি একই সঙ্গে আইন ও এমএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথমে বেদোর হোস্টেলের এ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও পরে কারমাইকেল হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন। তার উপরে তিনি ব্যারাকপুরে গভর্নমেন্ট স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রিন্টিং ও পাবলিশিং কোম্পানিও গড়ে তুলেছিলেন। কাজেই, নজরুল ইসলাম ও অন্যদের সঙ্গে পত্রালাপের কাজও আমাকেই করতে হতো। এইভাবেই চিঠিপত্রের মারফত ১৯১৮ সালে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এসব পত্রে সে যে শুধু আমাদের কুশল সংবাদ জানতে চাইত তা নয়, আমাদের পত্রিকায় ছাপানো লেখা সম্বন্ধেও তার মতামত জানাত। বর্ধমান জেলার অধিবাসী একজন জমাদার ছুটিতে এসে আমার সঙ্গে দেখাও করে গিয়েছিলেন। তার নাম কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

‘কাজী নজরুল প্রসঙ্গে’র এগারোর পৃষ্ঠায় আমি লিখেছি :
‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছাপানোর জন্য নজরুল যখন প্রথম লেখা পাঠিয়েছিল (১৯১৮ সনে) তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার পত্র লেখালেখি শুরু হয়।’

এখানে আমার অসাবধানতা যে প্রকাশ পেয়েছে তা আমায় স্বীকার করতেই হবে। এর একটি কারণ, আমি কম জায়গায় বেশি কথা বলার চেষ্টা করেছি। অন্য কারণ, লেখার সময়ে আমার হাতের কাছে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ ছিল না। তাই, আমার স্মৃতি আমার সঙ্গে প্রতারণা করতে পেরেছে। ১৯১৮ সালে নজরুল ইসলাম ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র ছাপানোর জন্য কোনো লেখাই পাঠায়নি। সে আমাদের প্রথম লেখা―একটি কবিতা―পাঠিয়েছিল ১৯১৯ সালে।

আমি কবি বা সাহিত্যিক নই। কাব্য বা সাহিত্যের আমি যে একজন সমঝ্দার সে―কথাও জোর গলায় প্রচার করার অধিকার আমার নেই। তবুও নজরুল ইসলামের প্রথম কবিতাটির পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে আমি অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম। সমালোচক ও সমঝ্দাররা কবিতাটির তারিফ করেননি। কেউ কেউ বলেছেন কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ। যিনি যা কিছু বলুন না কেন, আমি কিন্তু নজরুল ইসলামের কবিতায় তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। তার এই কবিতা এবং ‘হেনা’ ও ‘ব্যথার দান’ প্রভৃতি ছোটোগল্প পড়ে আমার মনে হয়েছিল যে বঙ্গ সাহিত্যে একজন শক্তিশালী কবি ও সাহিত্যিকের উদ্ভব হতে যাচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবলাম কবিতাটিকে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছাপাতে তো হবেই, আর তার ‘কোরক’-এর স্তম্ভ থেকেও তাকে বাঁচাতে হবে। ‘সাহিত্য পত্রিকা’য় ‘কোরক’ শিরোনাম দেওয়া একটি স্তম্ভ ছিল। তাতে নতুন কবিদের কবিতা বর্জাইস টাইপে ছাপা হতো। এটি ছিল মুহম্মদ মোজাম্মেল হক সাহেবের অতি প্রিয় বিভাগ, আর আমাদের দুচোখের বিষ। কারণ ঝুড়ি ঝুড়ি কবিতা এই ‘কোরক’-এর স্তম্ভের জন্য আসত। তার অল্প কটি আমরা ছাপতে পারতাম। নজরুল ইসলামের কবিতাটি অনেককে পড়িয়ে তার পক্ষে একটা আবহাওয়া আমি এই ভেবে তৈরি করে রেখেছিলাম যে ‘কোরক’-এ না ছাপানো নিয়ে মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে আমার হয়তো মতভেদ ঘটতে পারে। এরূপ মতভেদ ঘটলে অন্যদের মতের চাপে তাকে নোয়াতে হবে এই ছিল আমার ইচ্ছা। কিন্তু মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে আমার এই নিয়ে কোনো মতভেদ ঘটেনি। তার পূর্ণ সমর্থনে কবিতাটির নামও বদলে দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত কবিতা সম্বন্ধে আমি নির্লিপ্ত থাকতাম, কিন্তু কেন জানি না, নজরুল ইসলামের কবিতাটির বিষয়ে আমি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। অর্থাৎ, কবির কাঁচা রচনার কাঁচা সমঝ্দার বনে গিয়েছিলাম।


 

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...