রহীম শাহ আমার প্রিয় শিশুসাহিত্যিক। আমার যা যা লিখতে ইচ্ছা করে রহীম শাহ সেগুলো আগেই লিখে ফেলে। অথবা আমি যা যা করতে চাই রহীম শাহ সেগুলোই করে থাকে। সব ধরনের লেখাতেই তার স্বচ্ছন্দ। ছড়া ছোটোদের কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ- নিবন্ধ, জীবনী, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, বিজ্ঞান অনুবাদসহ শিশুসাহিত্যের প্রতিটা শাখায় তিনি সমান পারঙ্গম। তার প্রতিটা রচনাতেই প্রকৃতি ও মানব প্রেমের আচ্ছন্নতায় মগ্ন। শব্দ ব্যবহার, রূপকথা ধর্মী ভাষাভঙ্গি ও বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ তার রচনাসমূহ।
শিশুর মনোজগত তার লেখায় দরদী হৃদয় নিয়ে ধরা পড়ে। প্রকৃতি ও মানুষ তার লেখার প্রধান উপজীব্য। পাখি, বৃক্ষ, আকাশ, নদী, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ–এইসব বিষয়কে আখ্যান তৈরি করে মূলত তিনি লিখেছেন অনবরত। পাঁচ দশকের বিরতিহীন শিশুসাহিত্য চর্চার প্রেক্ষাপটে তার গ্রন্থসংখ্যাও প্রায় একশ পঞ্চাশটি। সবই শিশুসাহিত্যের বই। আমাদের দেশে পূর্ণাঙ্গ শিশসাহিত্যিকের সংখ্যা খুবই কম। সমকালীন লেখকদের মধ্যে রহীম শাহ অগ্রগণ্য।
রহীম শাহ দীর্ঘদিন ধরে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাশী। ২০২০- মুজিব বর্ষে শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ ঘোষণা হলো। পেয়েছেন রহীম শাহ। এতে আমরা ভীষণ আনন্দিত, গর্বিত। বাংলা একাডেমি পুরস্কার ভালো লেখার স্বীকৃতি। এই পুরস্কারের মাধ্যমে লেখার মান উন্নীত হবে না। কিন্তু প্রেরণা অনেক বড়।
রহীম শাহকে অভিনন্দন।
দুই.
রহীম শাহ’র সঙ্গে বন্ধুত্ব কবে থেকে? সে হিসাব আমরা দুজনেই ভুলে গেছি। আমাদের মনেও পড়ে না। রহীম শাহ ঢাকায় এলেন। আপাদমস্তক ঘোর লাগা আচ্ছন্ন এক তরুণ। শিশুসাহিত্য চর্চা করবেন এই তার ব্রত। আমাদের ঈষৎ অগ্রজ। কিন্তু বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। যেখানে ঠাঁই পেতে সময় লাগল না। চার দশক এই বন্ধুত্ব। প্রেম ভালোবাসা, ঝগড়া বিবাদ আমাদের নিত্যসঙ্গী। দুষ্টুমি, কথা, কৌতুক আর খোঁচাখুঁচি এই আমাদের প্রতিদিনের ব্যাপার। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কলকাতা সবখানেই আমরা হইচই, উচ্চকণ্ঠ আর পানাহার। কলকাতার কতবার যে আমাদের কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। আহারে সংক্ষিপ্ত জীবন।
আমাদের যৌবনের উজ্জ্বল দিনগুলোও এখন স্মৃতি!
রহীম শাহ একসময় কাজ করত শিশু একাডেমিতে। মহান সম্পাদক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ভেতরের রুমে একটা চেয়ার টেবিলে রহীম শাহ বসতেন। উল্টোদিকে ছড়াকবি ফারুক নওয়াজ।
সকাল থেকেই তরুণ লেখকদের ভিড়ে অগ্নিময় হয়ে উঠত সেই রুমটি। সুজন বড়ুয়ার টেবিলেও আড্ডার ফুল ফুটত প্রতিদিন। চোখ বন্ধ করলেই সেসব দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
সুজন বড়ুয়ার টেবিলে বসে বসে আমি অনেক লিখেছি। রহীম শাহ’র টেবিলেও। ওই টেবিলের সামনে বসলেই আমাদের কাজ কর্মের চিন্তাভাবনা লাটে উঠত। আড্ডাই তখন একমাত্র মোক্ষ। প্রয়াত বিপ্লব দাশ, আবু সাইদ জুবেরী, খায়রুল আলম সবুজ, মাহমুদউল্লাহ, সুকুমার বড়ুয়া, আখতার হুসেন, তপন বাগচী, সারওয়ার উল ইসলাম, হাসান হাফিজ–কে ছিলেন না সেসব আড্ডায়। শিশু একাডেমি উন্মুক্ত প্রান্তর, বৃক্ষশোভিত বাগান, ফুলের গাছ আমাদের হৃদয় টানত। এমন পরিবেশ ঢাকার কোথাও ছিল না।
মনে পড়ে রহীমের টেবিলে বসে বসে আমি অনেক ছোটোগল্প কিংবা ছড়া লিখে ফেলেছি আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে। লেখা শেষ করেই হয়তো দৌড় দিলাম দৈনিক বাংলার সাত ভাই চম্পা বিভাগের আফলাতুন ভাইয়ের কাছে। অথবা ছুটলাম হাটখোলা রোডে দৈনিক ইত্তেফাকের কচি ও কাঁচার আসরের বরেণ্য রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের কাছে। এই ছিল ছাত্রজীবনের সোনালি দিনগুলো। তখন শিশু একাডেমিতে কতই না আড্ডা দিয়েছি।
সুজন বড়ুয়া, ফারুক নওয়াজ, রহীম শাহ ছাড়াও সময় সুযোগ পেলেই কথা সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার সঙ্গে লনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিয়েছি। আরেকজনের কথা খুব মনে পড়ে। শিল্পী শওকাতুজ্জামান। রবীন্দ্র ভারতী থেকে উচ্চতর লেখাপড়া করে এসেছিলেন। স্বল্পদিনের জন্য শিশু একাডেমিতে চাকরি করেছিলেন। পরে আর্ট ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতা করেছেন। সবসময় পায়জামা পাঞ্জাবি পরতেন। সিগারেট খেতেন অনিয়মিত। শিশু একাডেমির বই ও শিশু পত্রিকায় ইলাস্ট্রেশান করতেন। তার স্ত্রী বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ফরিদা জামান। প্রয়াত শওকাতুজ্জামান এর সঙ্গে আড্ডার স্মৃতিও চির জাগরুক হয়ে আছে।
রহীমের টেবিলটা ছিল আমার বড়ো প্রিয়। রহীম শাহ মাঝেমধ্যে প্রেসে যেতেন। সে যুগে মোবাইল ছিল না। যোগাযোগের উপায় থাকত না। রহীমের সঙ্গে ছিল নিবিড় বন্ধুতা। খোলামেলা কথাবার্তা চলত আমাদের মধ্যে। রহীমকে অনেক গঞ্জনা দিতাম। সব সহ্য করত হাসিমুখে। সে আমলে দিনাতিপাত করার জন্য সামান্য অর্থ সংকুলানের ব্যবস্থাও ছিল না আমাদের। কিন্তু খরচের ব্যাপারে ছিলাম প্রত্যেকে উদার হস্ত।
রহীম শাহ তার ব্যতিক্রম নন। কত দুপুর তার পকেট কেটে খেয়েছি। চা সিগারেট এর বাছবিচার নেই। আহা, দেখতে দেখতে কত বসন্তই না চলে গেল। সময়ের পলি জমল আমাদের হৃদয়ে। আমরাও বৃদ্ধ হয়ে গেলাম শারীরিকভাবে। রহীমের শরীরেও হাজার ব্যধি। আমার অবস্থাও তথৈবচ। এইতো জীবন।
সেই দিনগুলোতে আর ফেরা যায় না কখনও। রহীম শাহ’র জ্যেষ্ঠপুত্র সামিন ইয়াসার অথই। সেও লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের ভাব অনুবাদ করে বছর দুই আগে সে শিশু একাডেমির অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে। অথই ভালো গান গায়। নিজে গান রচনাও করে।
অথইয়ের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক। রহীম শাহ’র সাথেও অথইয়ের সম্পর্ক পিতা-পুত্র বন্ধুতা।
রহীম এর জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারটা খুব জরুরি ছিল। প্রত্যেক বছর পুরস্কার ঘোষিত হয়। রহীমের নাম ঘোষণা হয় না। বেচারা হতাশ হয়ে পড়েছিল।
অন্ধকার কালো মেঘের সকল ভীতি কেটে এবার আলো ঝলমলে সূর্য উদিত হলো। রহীম শাহ’র পুরস্কার প্রাপ্তিতে ছোটোবড়ো সকলেই খুব আনন্দিত। তরুণ লেখকেরাও ফেসবুকে জয় উল্লাস করেছেন। সিনিয়ররাও আনন্দিত। রহীম শাহের পুরস্কার প্রাপ্তিতে কোনো বিতর্ক নাই। রহীম শাহ’র স্বাস্থ্য অনেকদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। তার দীর্ঘ জীবন, সুস্বাস্থ্য ও নিরোগ জীবন প্রত্যাশা করি।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...