শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৯ অপরাহ্ন
সত্তর দশক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময়, নাটকীয় এবং রক্তাক্ত একটি দশক । এই দশকের শুরুতে স্বাধিকার আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে । ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসকেরা প্রচার করত যে বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। তারা ভীতু ও তাদের সাহস নেই। কিন্তু ১৯৬৫ সালে লাহোর রণাঙ্গনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিক এবং বিমানবাহিনীর বাঙালি পাইলটরা অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড রক্ষা করেন। যুদ্ধে অসাধারণ রণদক্ষতার জন্য পাকিস্তানের সব ইউনিটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বীরত্বসূচক পদক পেয়েছিল বাঙালিদের এই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই যুদ্ধ বাঙালিদের শিখিয়েছিল যে সুযোগ ও সঠিক নেতৃত্ব পেলে রণক্ষেত্রে তারা যে কোনো শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হতে সক্ষম। এই আত্মবিশ্বাস ও রণকৌশলই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করতে বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ‘৬৫র যুদ্ধে বাঙালি যে সাহস দেখায় সেই সময় কবি মোহন রায়হান চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তখন থেকেই তাঁর লেখালেখি শুরু। ষাট,সত্তর আশির দশকগুলিই হচ্ছে তরঙ্গময় বাংলাদেশের উত্তরণ ও স্বপ্ন দেখার সময়। এই সময়কার প্রথমেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই ‘ঢেউ’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। আর কী আশ্চর্য, ‘সংকেত’ লিটল ম্যাগাজিনে ʼ৭০ এ যে প্রথম কবিতা ছাপা হয় তার নাম ‘শপথ’। অল্প বয়সেই কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প ও প্রবন্ধ লিখতেন। এগুলো বেতারে প্রচার ও পত্রিকায় ছাপাও হতো। বাল্য ও কৈশোরে হাফ প্যান্ট পরা অবস্থাতেই তিনি তার শহরের বড়দের সাহিত্য আড্ডায় যোগ দিতেন। রাজনৈতিকভাবেও সচেতন হতে থাকেন। ʼ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে আজ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি লড়াকু সৈনিক। ‘৭১এর মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তরুণ মুক্তিযুদ্ধার সাহস তো অদম্য হবেই। স্বদেশের জন্য তাঁরা জীবন বাজী রাখতে কসুর করেন না। সত্তর দশকের কবিদের সৌভাগ্য তারা একটা জাতির জন্ম সচক্ষে দেখেছেন। অনেকেই যুদ্ধে অংশও নিয়েছেন। এইরকম কবিই হচ্ছেন কবি আবিদ আনোয়ার, কবি মোহন রায়হান প্রমূখ। মোহন রায়হান অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ চিন্তার ধারক। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও সুদূরে প্রসারিত। তিনি পান,সিগারেট মাদক সহ কোনও ধরনের নেশার সাথেই কখনোই তিনি ছিলেন না। অনেত দিন ধরেই তিনি স্বাস্থ্যসম্মত তেলহীন খাবার খান এবং সাওল হার্ট সেন্টারের মাধ্যমে তেলহীন খাদ্য গ্রহণের আন্দোলনের সাথে যুক্ত। ভোজন বাঙালিকে তিনি হৃদরোগ মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। তার একটাই নেশা শ্রৈনীবৈষম্য দূর করে সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে চান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজাকারদের সঙ্গে তিনি কখনোই আপোষ করতে চান না। এই জন্যই সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও দেখি কবি মোহন রায়হানের অকুতভয় ভূমিকা। প্রতিক্রিয়াশীলদের দীর্ঘ ছাড়ার নিচে যেন দেশ আটকে না যায় এ জন্য তাঁর প্রানান্ত প্রচেষ্টা। এ জন্য ঢাকা থেকে নিজ জেলা, বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছিলেন । আমাদের স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ যেন অটুট থাকে সেই অঙ্গীকার নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন পথ থেকে পথে। একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন দেশ তোমাকে কি দিয়েছে সেই প্রশ্ন তুলে না, তুমি দেশের জন্য কি করেছো সেটাই ভাবো। কবি মোহন রায়হান সেই রকমই কবি। দেশের কাছ থেকে তিনি কিছু পেতে চান না। দেশ কে তিনি কিছু দিয়েই তৃপ্ত হতে চান। নানা সময় রাষ্ট্রপ্রধানদের বিভিন্ন প্রলোভন তিনি ঘৃণার প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই সমাজের
দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি এসব তাঁর চক্ষুশূল। মোহন রায়হান স্পষ্টবাদী কাউকে পরোয়া করে কথা বলেন না। এ জন্য বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই তিনি জেল খেটেছেন অনেকবার। বিশেষ করে স্বৈরাচার এরশাদের আমলে কবিতা লেখা এবং জাতীয় পর্যায়ের সমস্ত কবিদের সংগঠিত করে সামরিক শাসনের প্রতিবাদ করায় তাকে বারবার জেলে যেতে হয়েছিল। জেলে থেকেও তিনি পড়াশুনা ও কাব্য চর্চা অব্যাহত রাখেন। কিন্ত তিনি প্রথম জীবনে কবি হতে চাননি। রাজনীতিবিদও হতে চান নি। জহির রায়হান প্রমূখের শ্যুটিং দেখে হতে চেয়েছিলেন নায়ক। আশির দশকের শুরুতেই আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সামনের কাতারে চলে আসেন। অবশেষে তার নায়ক হওয়ার সাধ পূর্ণ হয়। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম নায়ক। সেই সাথে সুদর্শন এই কবি রাস্তায়,ক্যাম্পাসে জনসভায় উচ্চ স্বরে নিজের লেখা প্রতিবাদী ও বিদ্রোহের কবিতা পাঠ করে সারা বাংলাদেশে হয়ে ওঠেন কবিনায়ক।
আজীবন দেশপ্রেমিক স্পষ্টবাদী ও সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসী মোহন রায়হানের কবিতায় প্রতিবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভাষার কষাঘাত এতো তীব্র যে সেখানে কবিতার অলঙ্কার অগ্রাহ্য করে বখতিয়ারের মতো তীব্র গতিতে তিনি এগিয়ে যান। তাঁর কবিতা পড়লে বোঝা যায় যে নব্য স্বাধীন দেশের সব আন্দোলন সংগ্রামে তিনি বুক চেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শামসুর রাহমানের মতো সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া যে কোনও ঘটনা নিয়েই তিনি কবিতা লেখেন কিন্ত নিঁচু স্বরে নয় সরবে প্রতিবাদ জানিয়ে সাহসে বলিষ্ঠ হয়ে উচ্চ কন্ঠে। কবিতায় তিনি শাসকদের পরোয়া না করে প্রতিবাদে ভয়হীন। মোহন রায়হানের সব কবিতাই যে প্রতিবাদী এ কথা বললে তা প্রতি অবিচার করা হয়। তিনি গ্রামের জীবন ও নদীর সৌন্দর্য দেখে বেড়ে উঠেছেন। কবি আল মাহমুদের কবিতার মতো লোকজ ও দেশজ উপাদান ব্যবহার করে প্রকৃতি ও নারীর অপূর্ব মেলবন্ধন, এবং গ্রামবাংলার মানুষের প্রবহমান জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন তিনি বাংলা কবিতায় নতুন শিল্পরূপ ও স্বকীয়তায়। প্রেমময় কণ্ঠ কিন্ত তার কণ্ঠস্বর ভিন্ন।
এসো আরও কাছে এসো কিষাণী আমার
এই শক্ত হাতে তুমি কাস্তে তুলে দাও
নবান্ন উৎসবে ভরে উঠুক উঠান।…
কালো কিষাণের গান, আর হলো না বাড়ি ফেরা
একই কাব্য গ্রন্থের আরেকটি কবিতায় দেখি ভালোবাসার মায়াবী রুপ,জেলা শহরে বেড়ে ওঠা কবির প্রকৃতির প্রতি নস্টালজিক পিছন ফিরে দেখা।গ্রামের মাঠ,নদী,আকাশ, ফসলের মাঠ বনজোসনাও তাকে অনুগত প্রেমিক করে তোলে।
‘কতখানি বেদনার ,এই মাঠ,এই নদী আকাশের
অগণন তারা কালের প্রবাহে জেগে আছে?
তবু কি শুনতে পাও কোনও পথিকের ভাঙা পাথরের চাপা কান্না?
জ্যৎস্নার ভেতরে বাড়ি ফিরছি ক’দিন
চরাচর মাঠ ফসলের আদিগন্ত জমি,
ভেসে যায় ভেসে যায় চাঁদের বন্যায়
হু হু করে ওঠে মন:
এ রকম জ্যোৎস্নায় কোনও দিন তোমাকে নিয়ে
পথ হাঁটা হলো না আমার।
জ্যোৎস্নার ভেতর বাড়ি ফেরা,আর হলো না বাড়ি ফেরা
কিন্ত শেষাবধি ভাষার তীব্র কষাঘাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধেই তিনি সরব থাকেন। মানুষের কষ্ট,অপ্রাপ্তি ও যন্ত্রনাকে অনুভব করে তার পাশে থাকা এবং অবিচারের প্রতিবাদ করাই তো প্রকৃত কবির সাধনা।
আমি গ্রেনেডের মতো গর্জে উঠবো হুংকারে
অহংকারে ফেটে পড়বে রাজপথ…
যদি তুমি আসো, আমাদের ঐক্য আমাদের জয়
কবির কাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। শিল্পের জন্য কবিতা নাকি মানুষের জন্য কবিতা, এই প্রশ্নে কবি মোহন রায়হান সব সময় মানুষের পক্ষে। যিনি তার দেশকে ভালোবাসে। সামাজিক অন্যায়,নিপীড়ন, শোষণের শুধু বিরুদ্ধেই নয় এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে প্রয়োজনে শহিদ হতেও প্রস্তুত।
আমি তো বলেছি তোমাদের আমি দেবোই লিখে
সংগ্রাম ও ভালোবাসার খুনে রাঙা একটি টাটকা কবিতা।
আজ এ বেলা আমাকে আর উচ্ছেদ কোরো না
গোলাপ বাগান থেকে। ফুল হতে ফুলে
অকৃপণ উড়ে বেড়াতে দাও, ভালোবাসার অফুরন্ত
রেণু মেখে নিতে দাও রঙিন ডানায়।
কেননা কাল সকালে মিছিলে
আমি হতে চাই সর্বপ্রথম
বুলেটবিদ্ধ কৃষ্ণচূড়া।
কবি, সামরিক আদালতে অভিভাষণ
কবি মোহন রায়হান এ বছর ৭০-এ পদার্পন করলেন। আগামী ২২শে আগস্ট বিকেল ৫টায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মূল অডিটরিয়ামে কবির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সবাইকে আমন্ত্রণ।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...