বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন
কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া কবি মারুফুল ইসলাম। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর কবিতার চেয়ে ছড়া আমায় বেশি টানে। প্রকাশনা সংস্থা চন্দ্রাবতী একাডেমির কর্ণধার কামরুজ্জামান কাজলের কল্যাণে বেশ কয়েকটি ছড়ার বই পড়েছি আমি মারুফুলের। ফেসবুকেও পড়েছি বেশ কিছু ছড়া। সহজ সরল আটপৌড়ে ছড়া নির্মাণে আগ্রহী মারুফুল। নিরীক্ষা নয়, চিরায়ত বাংলা ছড়ার আদলটাই ছড়াকার হিশেবে পছন্দ তাঁর। প্রাচীন লোক ছড়ার ফরমেটেই অধিক সাচ্ছন্দ্য মারুফুলের। আঙ্গিকের দিক থেকে বিচার করলে লোক ছড়ার ঢং বা ভঙ্গিটাকেই মান্যতা দিতে চেয়েছেন মারুফুল তাঁর লেখা আলোচ্য ছড়াগ্রন্থ ‘রেলগাড়ি রেলগাড়ি মন’-এ ঠাঁই পাওয়া ৩৫টি ছড়ায়।
একালের ছড়াকার হলেও মারুফুল অনুসরণ বা অনুকরণ করেছেন সেকালের ছড়াকারদের। একালের মারুফুলের কণ্ঠে ধ্বণিত হয় সেকালের সুর। ছড়াগুলো পাঠ করার সময় সচেতন পাঠকের মনে হবে সেই প্রাচীন কালের নাম না জানা ছড়াকারই যেন বা কথা কইছেন।
কিংবা এভাবেও বলা যেতে পারে যে—অতীতের গৌরবদীপ্ত ছড়াসমূহ নতুন দীপ্তি নিয়ে পুনর্লিখিত হচ্ছে আধুনিক কালের একজন ছড়াকারের হাতে।
উদাহরণ হিশেবে রেলগাড়ি রেলগাড়ি মন-এর ১৭ নম্বর ছড়াটি পাঠ করা যাক। ছড়ার নাম ‘বাড়ি’—
ওই বাড়িটা সাদা
খুকুর দাদি দাদা
ওই বাড়িটা লাল
খুকুর রাঙা গাল
ওই বাড়িটা নীল
খুকুর গালে তিল
ওই বাড়িটা সবুজ
খুকুর টিয়ে অবুঝ
ওই বাড়িটা কালো
খুকুর চোখে আলো
ওই বাড়িটা কার
খুকুর মা-বাবার
খুকুর তবে কী
পুরো পৃথিবী
মারুফুল রচিত ছড়াটায় কোনো ওপর চালাকি নেই। চমকে দেওয়ার কোনো আকাক্সক্ষা নেই। বরং ধ্বনিগত এবং আঙ্গিকগতভাবে প্রবলভাবে চিরায়ত থাকবার আন্তরিক প্রয়াশ বা প্রচেষ্টা আছে। এবং সেই প্রয়াশ বা প্রচেষ্টাটি বিস্ময়কর রকমের সফল একটি উদ্যোগ।
বইটির ৩১ নম্বর ছড়াটাও পাঠ করা যেতে পারে।
ছড়ার নাম ‘মজা’।—
আমের মজা আঁটিতে
ধানের মজা কাটিতে
দুধের মজা খাঁটিতে
ঘাপটি মজা ঘাঁটিতে
চাটনি মজা চাটিতে
গোঁফের মজা ছাঁটিতে
ধরতে মজা ডাঁটিতে
ঘুমের মজা পাটিতে
ফুটির মজা ফাটিতে
ডালের মজা বাটিতে
গানের মজা ভাটিতে
বাঁচার মজা মাটিতে
পাঠক লক্ষ করুন, এই ছড়াটিতেও আমার সিদ্ধান্ত আগের ছড়াটার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশে উদ্গ্রীব। এই ছড়াটা পাঠ করার সময় পাঠক অপরূপ স্নিগ্ধ অনুচ্চ কণ্ঠে গীত গীতল একটা সুরের আবহে মন প্রসন্ন করা মায়াজালে বন্দি হবেন। ছড়ার সৌন্দর্য এবং ম্যাজিকটাও ঠিক এখানেই দীপ্যমান ও দৃশ্যমান। চোখ বোলানো যাক আলোচ্য বইটির ৩ নম্বর ছড়াটিতে। ছড়ার নাম
‘বাংলার রূপ ১’।—
ঝিলের জলে দু হাত বাড়ায় গাছ
চোখ বাড়িয়ে দেখে তাকে
ছোট্ট পুঁটি মাছ
দুলে ওঠে সাদা শাপলা ফুল
বুক দিয়ে সব বেঁধে রাখে
সবুজ দুটো কূল
ওড়ে বুঝি রোদমাখা এক চিল
রুপোলি ওই ছোট্ট পুঁটি
জলের বুকে তিল
নীল জলে লাল নৌকো ভাসে আর
তার ওপরে চড়ে খুকু
রূপ দেখে বাংলার
ছড়াকার মারুফুলের এই ছড়াটিতে একাধিকবার কবিতার উঁকিঝুঁকি। এবং এই ছড়ার আঙ্গিকগত অবয়বটি এখানে এই গ্রন্থে মুদ্রিত সিংহভাগ ছড়ার অবয়ব থেকেও খানিক আলাদা।
আমার বিবেচনায় মারুফুল ইসলাম রচিত ‘রেলগাড়ি রেলগাড়ি মন’ শীর্ষক ছড়াগ্রন্থটি একটি নিটোল ছড়াগ্রন্থ হিশেবে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে ওপার বাংলার শিল্পী দেবব্রত ঘোষের চমৎকার অলংকরণের সৌন্দর্যসমেত। যে গ্রন্থটি বাংলা প্রাচীন ও আধুনিক ছড়ার মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপনের আন্তরিক প্রচেষ্টারত।
মারুফুল ইসলামের ছড়াপ্রয়াসকে স্বাগত জানাই। আমাদের ছড়ার ভুবনটি আরো বর্ণিল বর্ণাঢ্য হয়ে উঠুক মারুফুল ইসলামের ছড়াসক্ষমতায়।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...