বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন

এই ছড়ার বইটি ‘বিশেষ’ : সুলতানা রাজিয়া

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ২৪৭ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৫ অপরাহ্ন

শিশুরা কখন ছড়ার সঙ্গে পরিচিত হয়? সম্ভবত, কথা বলতে শেখার আগেই। শিশু যখন নিজে কথা বলতেও পারে না তখন থেকেই তার সঙ্গে ছন্দবদ্ধ শব্দের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়াস দেখা যায় তার বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের। সুললিত সেই শব্দবন্ধের সুরধ্বনি শিশুর কানে যেতেই তার মুখে ফুটে ওঠে বিমল হাসি। তাই মানুষের সঙ্গে ছড়ার সম্পর্ক গভীর। শিশুকে গড়ে তুলতে বা শিশুচিত্তের বিকাশে কাজে লাগানো হয় এই সম্পর্ককে। এ জন্য বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়েছে প্রচুর শিক্ষামূলক ছড়া, একই সঙ্গে সুর ও ছন্দের দোলায় প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে তাদের শৈশবকে রাঙিয়ে দিতে। বাংলাদেশের সাহিত্য পরিম-লে যারা ছড়ার জগৎকে বহুদিকে প্রসারিত করে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে ফয়েজ আহমদ অগ্রগণ্য।

একদিকে তিনি শিশুসাহিত্যিক হিসেবে যেমন শিশুদের জন্য চিত্তাকর্ষক আমোদপূর্ণ ছড়া লিখেছেন তেমনি একজন রাজনীতি সচেতন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি হিসেবে চিত্তকে নাড়া দেওয়া সমাজজিজ্ঞাসায় পূর্ণ দ্রোহমূলক ছড়াও লিখেছেন।

সেসব রতœারাজির মধ্য থেকে একশটি ছড়া নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশ করেছে ‘ফয়েজ আহ্মদের শত ছড়া’। এই ছড়াগ্রন্থের প্রতিটি ছড়া শিশুদের উপযোগী হলেও প্রতিটি ছড়া শিশুচিত্তকে নেহায়েত আমোদিত করার জন্য নয়।

বইয়ের প্রথম ছড়াটিই শিশুমনকে আনন্দে উদ্বেলিত করে তুলবে। ফয়েজ আহ্্মদের অন্য অনেক পরিচয় থাকলেও তিনি যে মনেপ্রাণে একজন শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার সেটি স্পষ্ট করতেই হয়তো শত ছড়ার এই বিশেষ বইটির প্রথম ছড়া হিসেবে এই ‘কিন্তু চাঁদের জুড়ি নেই’ নামের ছড়াটি বেছে নিয়েছেন।

এই ছড়াটির প্রথম কয়েক লাইন হলো,

চাঁদের না যাওয়ার কারণ হিসেবে ছড়াকার আরও যে জিনিসগুলো না থাকার কথা বলেছেন সেগুলো হলো, চাঁদে মানুষ নেই তাই মানুষের ভুঁড়ি নেই, চাঁদের রসগোল্লা, পাউরুটি নেই, মুড়কি, ঝাল মুড়ি নেই।

এ জন্য যাওয়া যাবে না বটে, কিন্তু চাঁদের সৌন্দর্যকেও তিনি অস্বীকার করছেন না। সে জন্যই বলেছেন, কিন্তু চাঁদের জুড়ি নেই। ছড়াকারে লেখকের এই ছন্দবদ্ধ যুক্তি পড়তে কি যে মজা লাগে তুমি যখন পড়বে তখন স্বীকার করতে বাধ্য হবে।

ছড়া কী সেটাই বলেছেন ছড়াকার তার দ্বিতীয় ছড়াতে। ছড়া যেমন সমাজে হাসি ছড়িয়ে দেয় তেমনি যারা দুষ্টু তাদের যে শব্দের চাবুকে অতিষ্ট করে তোলে সেটিও ছড়াকার বলে দিয়েছেন। ‘ছড়ায় আছে’ নামের এই ছড়াটি তোমাদের জন্য তুলে না দিয়ে পারলাম না।

‘ছড়ায় আছে লিকলিকে এক ছড়ি

সপাং সপাং শব্দ

নষ্টরা সব জব্দ

চোখ রাঙিয়ে আসবে তড়িঘড়ি।

প্রথম থেকে প্রান্ত

ছড়ারা সব শান্ত

উঠবে খেপে বেপথ যদি ধরি।

ছড়ায় সমাজ চিত্র

ছড়ায় চিনে মিত্র

ছড়ায় হাসি হৃদয় দেবে ভরি।’

ছড়া যা করে ছড়াকারের কাজ তা-ই। ছড়াকার যেমন ছন্দে আনন্দে মানুষের মনকে মাতিয়ে তোলেন তেমনি ছড়ার চাবুকে সমাজের অত্যাচারী দুষ্টুদের ব্যতিব্যস্ত রাখতেও কসুর করেন না। ফয়েজ আহ্্মদ শুধু দুষ্টুদের চাবকে দিয়েই ক্ষান্ত দেননি, বরং যাদের মনোযোগ আর প্রতিবাদের অভাবে দুষ্টুরা এমন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন তাদের প্রশ্ন করতে, জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে আলস্য করেননি। ‘কেন না’ ছড়ায় তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখেছেন, এ অপরাধ, এত প্রবঞ্চনা, এত অত্যাচার, এত হঠকারিতা দেখার পরও কেন তাদের চিত্তে আগুন জ¦লে না।

এই একশটি ছড়ার মধ্যে সব ধরনের ছড়া স্থান পেয়েছে। কাহিনিভিত্তিক ছড়া, ব্যক্তিকে উৎসর্গীকৃত ছড়া, নতুন দিনের ছড়া, অর্থহীন ছড়া, দেশত্মবোধক ছড়া, শ্রেণিহীন চেতনার ছড়া, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছড়া, ইতিহাস আশ্রিত ছড়া, দ্বিপদী ছড়া, নিরীক্ষামূলক ছড়া প্রভৃতি। এই একশটি ছড়ার মাঝে বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যের চড়াই-উৎরাই যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি ফুটে উঠেছে ইংরেজ শাসনামল থেকে কীভাবে আজকের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হলো। ছড়া পাঠের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে দেশ-মাটি-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা, চিত্তের আনন্দ, মস্তিষ্কে সচেতনতার অনুরণন একই বইয়ের মাঝে এতকিছু পাওয়া আর অন্য কোনো বইয়ে কী সম্ভব? ছড়া এবং ছড়ার বই সবসময় এ জন্যই বিশেষ!

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...