বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলার অহংকার : শাহেদ ইকবাল

কবিতা বাংলা ডেস্ক / ১২২ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮ অপরাহ্ন

ইতিহাস থেকে দেখা যাচ্ছে তিনি দিল্লির জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত The Peshwa পত্রিকায় মহানবী (সা) এর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপক বাণী লিখেছিলেন (২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬)। তারও আগে মহানবীর (সা) জন্মদিন উপলক্ষে একটি বাণী পাঠিয়েছিলেন স্যার আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীকে, যা ২৫ জুন ১৯৩৪ তারিখে আকাশবাণীতে প্রচারিত হয়েছিল। সেই বাণীতে তিনি লিখেছিলেন-
‘ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের একটি। এই কারণে ইহার অনুবর্তিগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ব সম্বন্ধে তাহাদিগকে সাক্ষ্য দিতে হইবে। ভারতে যে সকল বিভিন্ন ধর্মসমাজ আছে তাহাদের পরস্পরের প্রতি সভ্যজাতিযোগ্য মনোভাব যদি উদভাবিত করিতে হয়, তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা তাহা সম্ভবপর হইবে না, তবে আমাদিগকে নির্ভর করিতে হইবে সেই অনুপ্রেরণার প্রতি, যাহা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ও মানবের বন্ধু সত্যদূতদিগের অমর জীবন হইতে চির-উৎসারিত। অদ্যকার এই পূণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মোসলেম ভ্রাতাদের সহিত একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশে আমার ভক্তি-উপহার অর্পণ করিয়া উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁহার আশীর্বাদ ও সান্ত্বনা কামনা করি।’
ইতিহাস থেকে আরও জানা যাচ্ছে, ১৯১১ সালের নভেম্বরে শান্তি নিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে একজন মুসলমান তাঁর পুত্রকে ভর্তি করার প্রস্তাব দেন। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছেলেটিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে নেওয়ার জন্য সুপারিশ করে বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেপালচন্দ্রকে একটি চিঠি লেখেন। নেপালচন্দ্রের নিকট থেকে উত্তর না পেয়ে তিনি পুনরায় ২রা নভেম্বর আরেকটি পত্রে লেখেন:
‘মুসলমান ছাত্রটির সঙ্গে একজন চাকর দিতে তাহার পিতা রাজী। অতএব এমন কি অসুবিধা, ছাত্রদের মধ্যে এবং অধ্যাপকদের মধ্যেও যাহাদের আপত্তি নাই তাঁহারা তাহার সঙ্গে খাইবেন। শুধু তাই নয়—সেই সকল ছাত্রের সঙ্গেই ঐ বালকটিকে রাখিলে সে নিজেকে নিতান্ত যূথভ্রষ্ট বলিয়া অনুভব করিবে না। একটি ছেলে লইয়া পরীক্ষা সুরু করা ভাল অনেকগুলি ছাত্র লইয়া তখন যদি পরিবত্তর্ন আবশ্যক হয়, সহজ হইবে না। আপাতত শাল বাগানের দুই ঘরে নগেন আইচের তত্ত্বাবধানে আরো গুটি কয়েক ছাত্রের সঙ্গে একত্র রাখিলে কেন অসুবিধা হইবে বুঝিতে পারিতেছি না। আপনারা মুসলমান রুটিওয়ালা পর্যন্ত চালাইয়া দিতে চান, ছাত্র কি অপরাধ করিল? এক সঙ্গে হিন্দু মুসলমান কি এক শ্রেণীতে পড়িতে বা একই ক্ষেত্রে খেলা করিতে পারে না?…প্রাচীন তপোবনে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খাইত, আধুনিক তপোবনে যদি হিন্দু মুসলমানে একত্রে জল না খায় তবে আমাদের সমস্ত তপস্যাই মিথ্যা।’
তবে সে-যাত্রা রবীন্দ্রনাথের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। দশ বছর পরে বিদ্যালয়ের বিশ্বভারতী পর্বে সৈয়দ মুজতবা আলী প্রথম মুসলিম ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন।
১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ঢাকা থেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা ও ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী আবদুল ওদুদ শান্তিনিকেতনে নিজাম বক্তৃতায় অংশ নেন। বিশ্বভারতীর অর্থায়নে নিজাম বক্তৃতার আয়োজন করা হতো। আবদুল ওদুদ ছিলেন প্রথম বক্তা। ১৯৩৫ সালে ২৬-২৮শে মার্চ তিনদিন তিনি শান্তি নিকেতনে তিনটি বক্তৃতা দেন। তাঁর দুটি প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘মুসলমানের পরিচয়’ ও ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ’।
রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ অবস্থাতেও সভায় উপস্থিত হন। পঠিত তিনটি প্রবন্ধের সংকলন ‘হিন্দু-মুসলমান বিরোধ’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে, বিশ্বভারতী থেকে। বইটির ভূমিকাও লিখে দেন তিনি।
ওদুদের প্রবন্ধপাঠে অংশ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন: ‘এদেশের হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের বিভীষিকায় মন যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এই বর্বরতার অন্ত কোথায় ভেবে পায় না, তখন মাঝে মাঝে দূর দূরে সহসা দেখতে পাই দুই বিপরীত কূলকে দুই বাহু দিয়ে আপন করে আছে এমন এক-একটি সেতু। আবদুল ওদুদ সাহেবের চিত্তবৃত্তির ঔদার্য্য সেই মিলনের একটি প্রশস্ত পথ রূপে যখন আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে তখনি আশান্বিত মনে আমি তাঁকে নমস্কার করেছি।’
মৌলানা জিয়াউদ্দীন প্রথমে শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্বভারতীর বিদ্যাভবনে ইসলামি সংস্কৃতির শিক্ষক ছিলেন। তিনি সদ-বন্দ-ই-টেগোর নামে ১০০টি রবীন্দ্র-কবিতা ও গানের ফারসি তর্জমা ও কলম-ই-টেগোর নামে উর্দু তর্জমার বই বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশ করেন (১৯৩৫)। তাঁর অকালমৃত্যুতে শোকাহত রবীন্দ্রনাথ ‘মৌলানা জিয়াউদ্দীন’ নামের সুদীর্ঘ কবিতাটি লেখেন (নবজাতক ১৯৪০) এবং শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত শোকসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। ইসলামি ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে জিয়াউদ্দীনের একটি বইও বিশ্বভারতী প্রকাশ করেছিল।
রবীন্দ্রনাথের সাথে কাজী নজরুল ইসলামের ছিল ঐতিহাসিক ভালোবাসার সম্পর্ক। নজরুল ছিলেন দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহধন্য ও আশীর্বাদপুষ্ট। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন এই যুক্তিতে যে নজরুল বাংলা সাহিত্যে বসন্ত এনেছেন। নজরুলের ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় কবিগুরু যে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন তা চিরকালের ইতিহাস হয়ে আছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
“আয় চলে আয়রে ধুমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলকরেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।”
কল্পনা করা যায়? যে পত্রিকার জন্য নজরুল রাজদ্রোহী হয়ে জেলে গিয়েছিলেন সেই পত্রিকায় নজরুলকে বিদ্রোহের উস্কানি দিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ! শুধু তাই নয়, নজরুল যখন কারাগারে তখন নজরুলকে ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করে তা নজরুলের কাছে জেলখানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আনন্দে ও উৎসাহে নজরুল আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। অথচ আজ নিন্দুকেরা রটনা করছে কবিগুরু নাকি ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির ‘দালাল’ ছিলেন!
নজরুল সারাজীবন রবীন্দ্রনাথের এই আশীর্বাদ ও ভালোবাসার কথা ভোলেননি। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নজরুলের সমান স্তুতিমূলক কবিতা আর কেউ লিখেননি। কবিগুরুর মহাপ্রয়াণে নজরুলের মতো এমন শোকগাথাও আর কেউ লিখেননি। রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রায় আকাশবাণী বেতারকেন্দ্র থেকে ধারাভাষ্যকার ছিলেন নজরুল।
নজরুলের বিখ্যাত ‘সালাম অস্ত রবি’ কবিতার কিছু চরণ উদ্ধৃত করছি-
“ব্যাস, বাল্মিকী, কালিদাস, খৈয়াম, হাফিজ, রুমী,
আরবের ইমরুল কায়েস, যে ছিলে একসাথে তুমি!
সকল দেশের সকল কালের সকল কবিরে ভাঙি
তাঁহাদের রূপে রসে রাঙাইয়া, বুঝি কত যুগ জাগি’
তোমারে রচিল রসিক বিধাতা, অপরূপ সে বিলাস,
তব রূপে গুণে ছিল যে পরম সুন্দরের আভাস।
— — — — — — — — — —
তুমি যেন সেই খোদার রহম এসেছিলে রূপ ধরে
আর্শের ছায়া দেখাইয়াছিলে রূপের আর্শি ভরে
কালাম ঝরেছে তোমার কলমে, সালাম লইয়া যাও
ঊর্ধ্বে থাকি এ পাষাণ জাতিরে রসে গলাইয়া দাও।”

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...