দুপুরের ভাতঘুম থেকে আমাকে জাগিয়ে দিল কবি অরবিন্দ চক্রবর্তীর ফোন। কবি জরিনা আখতারের গৃহে আড্ডা হবে ভরসন্ধ্যায়। আড্ডায় যোগ দিবেন কবি পিয়াস মজিদ ও কথাসাহিত্যিক নভেরা হোসেন। পিয়াস ব্যতীত আমরা সকলেই মিরপুরের বাসিন্দা। মিরপুরনিবাসী আরও ডজন ডজন কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আমরাও আছি। আছেন সত্তর দশকের কবি জরিনা আখতার যিনি আমাদের মধ্যে দশক ও বয়স― দুটোর বিচারেই অগ্রজ। সম্প্রতি তিনি লেখালেখি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে চাঁদপুরের চন্দ্রাবতী সাহিত্য একাডেমি থেকে কবিতায় সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। আড্ডার অন্যতম উদ্দেশ্য তাকে অভিনন্দন জানানো ও তাঁর লেখালেখি সম্পর্কে জানা। দীর্ঘ কবিজীবনের সায়াহ্নে এসে পুরস্কারপ্রাপ্তি এই ইঙ্গিত দেয় যে তিনি প্রবলভাবে উপেক্ষিতা।
মিরপুর ১০ এলাকাটি তার মোড়ের, বিখ্যাত বলি কিংবা শ্বাসরুদ্ধকর, মোড়লিপনার জন্য সুপরিচিত তো বটেই। তার তিনটি ব্লক― এ বি সি পরস্পরের লাগোয়া হলেও খুব যে নিকটবর্তী তা নয়। সবচেয়ে পুবের সি ব্লকে থাকি আমি, সেদিন দেখেছি কবি আলতাফ হোসেন থাকেন পশ্চিমের বি ব্লকে। জরিনা আখতারের গৃহ এ ব্লকে। ভাবলাম সেটা আরও পশ্চিমে হবে। খুঁজতে গিয়ে দেখি উত্তরে, মিরপুরের সবচেয়ে ঝলমলে, সবচেয়ে জমকালো বেনারশী পল্লীটাই এ ব্লক। কথা ছিল আমরা সুপরিচিত রাব্বানী হোটেলে একত্রিত হয়ে একসাথে কবিগৃহে যাব । কেউ আলাদা বা সরাসরি যাব না। আমি রাব্বানী হোটেলে গিয়ে বসে আছি; অরবিন্দ চক্রবর্তী দেরি করে বাসা থেকে বের হয়ে সরাসরি চলে যেতে চাইলে আমি বাধ সাধি। কেননা, সেই তো আমার সরাসরি চলে যাওয়ার প্রস্তাবে বাধ সেধেছিল। পরে সে বাসায় পৌঁছে দেখি নভেরা হোসেন ও পিয়াস মজিদ ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছেন এবং স্ব স্ব আসনে পাকাপোক্ত হয়েছেন।
জরিনা আখতার যে অ্যাপার্টমেন্টটিতে থাকেন তার পাশের মিরর ইমেজ অ্যাপার্টমেন্টটিতে থাকেন তার ছোট বোন। তিন বোনের তৃতীয়জন থাকেন উপর তলায়; তার পাশের অ্যাপার্টমেন্টটি তিন ভাইয়ের একজনের। অপর দুভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্ট নিচে। ছয় ভাই-বোন এক বাড়িতে- এ তথ্যই বলে দেয় এটি তাদের পৈত্রিকবাড়ি। ১২ অ্যাপার্টমেন্টের বাকি ৬টি নিয়েছে বিল্ডার। আমি মনে মনে প্রশংসা করি তাদের দূরদর্শী পিতার, বহুকাল আগে যিনি প্লটটি কিনে রেখেছিলেন সন্তানদের বসবাসের জন্য। জরিনা আখতারের জন্ম ঢাকাতে হলেও পিতৃপুরুষের বাড়ি সীমান্তের ওপারে মালদা জেলায়।
আজকের আড্ডার মধ্যমণি অবশ্যই কবি জরিনা আখতার, আমরা তিন অনুজ তাঁর জীবন ও লেখালেখি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আমাদের ভূমিকা হয় অনেকটা অপেশাদার সাংবাদিকের মতো যারা প্রস্তুতিবিহীন ইন্টারভ্যু নিতে বসেছেন একজন অগ্রজ কবির, যিনি নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন বহুবছর। আমাদের প্রথম প্রশ্ন― কবে থেকে লেখালেখির শুরু?
তখন তিনি কামরুন্নেসা স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। ইংরেজি শিক্ষককে নিয়ে প্রথম ছড়াটি লিখেছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম ইংরেজির শিক্ষক বোধকরি বালিকার চোখে হিরো ছিল। না উল্টো, কোন অদৃশ্য কারণে ছাত্রীটি তার শিক্ষককে পছন্দ করত না। তাই ছড়াটি হলো তীর্যক। ছন্দ না জেনেই ছন্দোবদ্ধ পদ লেখার প্রয়াস পেলেন। তার একটি বাধাই করা খাতা ছিল, তার প্রথম পৃষ্ঠায় লিখলেন ছড়াটি। স্কুল জীবন নিয়েই অনেকগুলো ছড়া লিখলেন আর বাধাই খাতার পৃষ্ঠাসকল ভরে উঠতে লাগল। আশ্চর্য যে ছড়া দিয়ে কবিতা লেখার শুরু হলেও তিনি আজও কোনো ছড়ার বই প্রকাশ করেননি। আমি চার কবির জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম আমার একমাত্র ছড়ার বই ‘নাতির জন্য ছড়া’। বইটির ভেতরের ইলাস্ট্রেশন দেখে পিয়াস মজিদ বলল, এসব ছবি দেখে ছোটোবেলার পাঠ্যবইয়ের কথা মনে পড়ে গেল।
জরিনা আখতারের প্রথম কবিতা ’আগামী দিনের নাগরিক’ মুদ্রিত হয় পুরনো ঢাকা থেকে প্রকাশিত নবাবাগঞ্জ সাময়িকীতে। পত্রিকাটির সম্পাদক এ কে এম নূর মোহাম্মদ ছিলেন একজন কবি এবং তার মায়ের মামা। কবিতার প্রথম পঙক্তি ছিল ‘’আগামী দিনের নাগরিক নহে মহীয়ান’। সম্পাদক নানা সেটি ঠিক করে দিলেন ‘নহে’ কেটে ‘অতি’ বসিয়ে। ছড়া ও কবিতা লেখার পাশাপাশি ছবি আঁকতেন আর এই ছবি আঁকার শুরু প্রাইমারী শ্রেণি থেকেই। একটা সময় ভাবতেন লেখালেখি করবেন না, শুধু ছবি আঁকবেন। ইচ্ছে ছিল আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার। মাকে বলেছিলেন সে গোপন ইচ্ছার কথা। সেসময় ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে কোনো ডিগ্রি দেওয়া হতো না, ডিপ্লোমা দেওয়া হতো। একে আর্ট, উপরন্তু ডিগ্রি নেই, তার বাবা রাজি হলেন না। বাবার নিষেধ শুনে তিনি কেঁদেছিলেন ।
স্কুলের পাঠ শেষ হলে ভর্তি হয়েছিলেন বদরুন্নেসা কলেজে। তখন এর নাম ছিল গভর্নমেন্ট ইন্টারমেডিয়েট কলেজ। কলেজে গিয়ে তার লেখালেখি বেড়ে গেল, যদিও সহপাঠিনীদের মাঝে কেউ কবিতা লিখত না। ইন্টারমেডিয়েট শেষে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন ইডেন কলেজে। সেসময়ে ‘বেগম’ পত্রিকায় লিখতেন। লিখে যে ছাপাতে হবে তা প্রথমদিকে জানতেন না। নিজে নিজে শিখেছেন লেখা পাঠানোর গুরুত্ব। তখন হাতে হাতে লেখা দিয়ে আসতে হতো সম্পাদকদের টেবিলে। দৈনিক বাংলায় একটা ’মহিলা পাতা’ ছিল, সেখানে লেখা ছাপা হতো। এছাড়া কবিতা পাঠাতেন দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদে। ছাপাও হতো, যদিও দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী খুব বেশি ছাপতেন না। দৈনিক বাংলার আহসান হাবীব বেশি কবিতা ছাপতেন। তখন বাংলা একাডেমির সাহিত্য পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনা করতেন কবি রফিক আজাদ। তিনি বেশ সহনশীল ছিলেন, ভুল ধরিয়ে দিতেন, ছন্দ শুধরে দিতেন। উত্তরাধিকারে তার অনেক কবিতা ছাপা হয়েছিল। তিনি বাংলায় মাস্টার্স পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি। তখন সত্তর দশকের কবিরা অকাতরে লিখছেন। নারীদের মাঝে ছিলেন শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, নাসিমা সুলতানা প্রমুখ। সত্তরের এক ঝাঁক কবির সাথে তাঁর পরিচয় ছিল― এরা হলেন নাসির আহমেদ, মাহবুব হাসান, ফারুক মাহমুদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আতাহার খান, ত্রিদিব দস্তিদার প্রমুখ। এরা সবাই জরিনা আখতারের সমসাময়িক। তখন রেডিওতে কবিতা পাঠের আসর বসত। রেডিওতে কবিতা পড়েছেন, অনুষ্ঠানেও কবিতা পড়েছেন।
ঢাকার বাইরে খুব একটা সাহিত্য উৎসবে যাননি। একবার খুলনায় গিয়েছিলেন সাহিত্য উৎসবে, অন্যবার কুমিল্লার অলক্ত সাহিত্য উৎসবে। ’অলক্ত’ শুনে কুমিল্লার সন্তান পিয়াস মজিদ লাফিয়ে উঠল। আবদুল মান্নান সৈয়দ কুমিল্লায় গিয়েছিলেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার নিতে। সেই প্রথম পিয়াস মজিদ আবদুল মান্নান সৈয়দকে দেখতে পেয়েছিল। সে দেখল কবিতা বিষয়ক ভাবনা ও উপলব্ধি দিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ ৫/৬ পাতার একটি ফোল্ডার বানিয়ে লেখকদের মাঝে বিতরণ করছেন। পরে এই গদ্যটিই তিনি তাঁর কবিতাসমগ্রের ভূমিকায় ছেপেছিলেন।
অরবিন্দ চক্রবর্তীর বাড়ি ভাঙা উপজেলায় শুনে আবদুল মান্নান সৈয়দ সেকালের টিএন্ডটি ফোনে এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন, জানতে চেয়েছিলেন ‘রস’ গল্পখ্যাত সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কথা। এখানে আসার প্রথমদিকটায় আমাদের কার কোথায় গ্রামের বাড়ি নিয়ে আলোচনায় অরবিন্দর গ্রাম রায়পাড়া সদরদি নিয়ে কথা হচ্ছিল। অরবিন্দ বলেছিল রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘পালঙ্ক’ চলচ্চিত্রের কাহিনিও নরেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখা। আর ছবিটির শ্যুটিংও হয়েছিল ঐ গ্রামে। এতে ক্ষয়িষ্ণু জমিদার রাজমোহনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত আর দরিদ্র মুসলমান প্রজার চরিত্র মকবুল হিসেবে অভিনয় করেছিলেন আনোয়ার হোসেন। দুই কিংবদন্তির অভিনয় করা নাট্যধর্মী ছায়াছবিটি ভারতীয় জাতীয় পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছিল। মকবুল চরিত্রটি যাকে নিয়ে লিখেছিলেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র সেই মোতালেবকে চিনতেন অরবিন্দ। তাদের বাড়ি ছিল সন্নিহিত।
আমাদের তিনজনের মাঝে অগ্রজ কবি-সাহিত্যিকদের সাথে বেশি মিশেছে পিয়াস মজিদ। অগ্রজদের সাথে, তাদের মাঝে বিখ্যাতরাই সংখ্যায় অধিক, আলাপচারিতা, তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়াও পিয়াস মজিদই বেশি করেছে। আজও তাকে দেখি অগ্রবর্তী ভূমিকায়। পিয়াসের প্রশ্ন ছিল কবিতা লেখায় তাকে কে অনুপ্রাণিত করেছিল? এর উত্তরে জরিনা আখতার বললেন, কেউ নয়। তিনি নিজে নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, কেন হয়েছেন তাও সুষ্পষ্ট নয়। সেসময় মেয়েদের লেখালেখিতে পরিবারের কেউ উৎসাহ দিত না। পরিবার, সমাজ নিরুৎসাহিত করত লিখতে। বই-পত্র তেমন পাওয়া যেত না। তাদের পরিবারে সাহিত্যের বই তেমন একটা ছিল না, ম্যাগাজিনও নয়। তবে সবাই দৈনিক পত্রিকা রাখত বাসায়। এ বাড়িতে দৈনিক বাংলা রাখা হতো তো প্রতিবেশি বাড়িতে ইত্তেফাক। পত্রিকা ধার করে এনে পড়তেন। শেয়ারিং হতো খুব। প্রতি রোববার দৈনিকের সাহিত্য পাতা পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন।
শৈশবে একটি বই তাকে খুব মুগ্ধ করেছিল― ‘শিশু সাথী সংকলন’। সংকলনটি তিনি বহুবার পাঠ করেছেন। সেখানে একটি পঙক্তি ‘বড়ো যদি হতে চাও ছোট হও তবে’ তাকে খুব আলোড়িত করেছিল। প্রথমে বুঝতে পারেননি এর মর্মার্থ। ‘বড়ো হতে হলে ছোট হতে হবে কেন?’ এমন একটি জিজ্ঞাসা তিনি বহুদিন নিজের ভেতর বয়ে বেড়িয়েছেন, মাথায় ঘুরপাক খেত বাক্যটি। পরে এর অর্থ বুঝেছেন।
সত্তর দশকের কবি হলেও জরিনা আখতারের প্রথম কবিতার বই ‘কালো ময়ূরের ডাক’ প্রকাশিত হয় আশির দশকের মাঝামাঝি ১৯৮৬ সালে। প্রকাশ করেন ‘রূপম’ ও ‘কিছুধ্বনি’ খ্যাত সম্পাদক আনওয়ার আহমেদ। রূপম নামে তাঁর একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিল। তাদের স্ব স্ব আত্মজীবনীতে জরিনা আখতার ও এ বইটির উল্লেখ করেছেন আল মাহমুদ ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। এছাড়া তেমন কোন রিভিয়্যু প্রকাশিত হয়নি। পরিবারে প্রতিক্রিয়া? না সেটাও তিনি পাননি। একটা কঠোর পরিবেশের মধ্যে, চারপাশে নিষেধের প্রহরা, তিনি বড়ো হয়েছেন।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...